নারায়ণগঞ্জ বৃহস্পতিবার | ১৯শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ বসন্তকাল | ৩০শে রমজান, ১৪৪৭ হিজরি
  সর্বশেষ
নারায়ণগঞ্জে জামায়াতে ইসলামীর  ঈদ সামগ্রী বিতরণ: Tnntv24
রূপগঞ্জে পুলিশের ওপর হামলাসহ ১২ মামলার আসামি গ্রেফতার: Tnntv24
নারায়ণগঞ্জ লঞ্চ টার্মিনালে মোবাইল কোর্ট: চার লঞ্চে ২০ হাজার টাকা জরিমানা। Tnntv24
রমজানে নিরাপদ খাদ্য: চাহিদা মেটাই, বিষ খাই মো আব্দুল্লাহ খান মুন্না ।লেখক; সাংবাদিক ও উপস্থাপক,সবুজ কৃষি।জিটিভি: Tnntv24
তিন পুলিশ প্রত্যাহার রূপগঞ্জে ঈদকে ঘিরে ৩শ’ মাদকের স্পট সক্রিয় ॥ বিপুল মাদকদ্রব্য মজুদ : Tnntv24
ঈদে ঘরমুখো মানুষের মহাসড়কে যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে মাঠে থাকবে র‍্যাব-১১: Tnntv24
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির অনুমোদন:আহবায়ক-যুবাইর,সদস্য সচিব-জোবায়ের। Tnntv24
প্রধানমন্ত্রীর ঈদ বিশেষ অনুদান পেলো নারায়ণগঞ্জের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। Tnntv24
বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ, ২৪ ঘণ্টায় বিচার না পেলে আত্মহত্যার হুমকি ভুক্তভোগীর: Tnntv24
রূপগঞ্জে সাংবাদিকদের হুমকি-অপহরণে  নারায়ণগঞ্জ সাংবাদিক ফোরামের উদ্বেগ : Tnntv24
Next
Prev

রমজানে নিরাপদ খাদ্য: চাহিদা মেটাই, বিষ খাই মো আব্দুল্লাহ খান মুন্না ।লেখক; সাংবাদিক ও উপস্থাপক,সবুজ কৃষি।জিটিভি: Tnntv24

রমজানে নিরাপদ খাদ্য: চাহিদা মেটাই, বিষ খাই মো আব্দুল্লাহ খান মুন্না ।লেখক; সাংবাদিক ও উপস্থাপক,সবুজ কৃষি।জিটিভি: Tnntv24

Facebook
WhatsApp
LinkedIn
রমজানে নিরাপদ খাদ্য: চাহিদা মেটাই, বিষ খাই মো আব্দুল্লাহ খান মুন্না ।লেখক; সাংবাদিক ও উপস্থাপক,সবুজ কৃষি।জিটিভি: Tnntv24
রমজানে নিরাপদ খাদ্য: চাহিদা মেটাই, বিষ খাই
মো আব্দুল্লাহ খান মুন্না ।লেখক; সাংবাদিক ও উপস্থাপক,সবুজ কৃষি।জিটিভি
Tnntv24.শফিকুল আলম ভুইয়া নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
রমজান সংযম, আত্মশুদ্ধি ও মানবিকতার মাস। এই মাসে মানুষের খাদ্যাভ্যাস, ভোগ্যপণ্যের চাহিদা ও বাজার পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। সারাদিন রোযা রাখার পর ইফতার ও সাহরিতে আমরা যে খাবার গ্রহণ করি, তা শরীরের জন্য যেমন পুষ্টিকর হওয়া জরুরি, তেমনি নিরাপদ হওয়াও অপরিহার্য। কিন্তু বাস্তবতা হলো—রমজান এলেই খাদ্যের চাহিদা যেমন বাড়ে, তেমনি অনিরাপদ ও বিষাক্ত খাদ্যের ঝুঁকিও বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। আমরা হয়তো প্রয়োজনীয় খাদ্য সংগ্রহ করছি, কিন্তু অজান্তেই বিষ গ্রহণ করছি—এটাই বর্তমান বাংলাদেশের খাদ্য বাস্তবতার করুণ চিত্র।
বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার কথা বলে গর্ব করে। ধান, মাছ, সবজি ও ফলের উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বর্তমানে মাছ উৎপাদনে বিশ্বে শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর একটি এবং সবজি উৎপাদনেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। কিন্তু উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। মাঠ থেকে বাজার পর্যন্ত পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে অতিরিক্ত কীটনাশক, রাসায়নিক সার, গ্রোথ হরমোন, কৃত্রিম রং, ফল পাকানোর ক্ষতিকর উপাদান এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে অননুমোদিত কেমিক্যাল ব্যবহারের কারণে খাবার দিন দিন অনিরাপদ হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাজারে পাওয়া ফল ও সবজির একটি বড় অংশে অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বেশি কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায়। এসব বিষাক্ত উপাদান মানবদেহে জমা হয়ে দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসার, কিডনি বিকল, লিভার সিরোসিস, হৃদরোগ ও হরমোনজনিত সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়। শিশু ও গর্ভবতী নারীরা এসব বিষাক্ত খাদ্যের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী।
রমজানে ফলের গুরুত্ব অপরিসীম। সারাদিন রোযা রাখার পর শরীরের পানিশূন্যতা দূর করতে লেবু, কলা ও খেজুর ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। লেবু বৈজ্ঞানিকভাবে ফল হলেও বাংলাদেশে এটি সবজি হিসেবে পরিচিত। রমজানে শরীরের ইলেক্ট্রোলাইট ভারসাম্য রক্ষা করতে লেবুর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই সুযোগে কৃষক, ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগীরা দাম বাড়িয়ে পকেট ভারী করছে। কাগজি লেবু ও কলম্বো লেবুর দাম অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। অথচ বেশি দাম দিলেই নিরাপদ খাদ্য পাওয়া যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
কলা রমজানের আরেকটি অবিচ্ছেদ্য ফল। ইফতার ও সাহরিতে কলার ব্যবহার ব্যাপক। কিন্তু কলা উৎপাদনের ক্ষেত্রেও নিরাপদ খাদ্যের প্রশ্ন উঠছে। মানিকগঞ্জের ফকিরহাটি ইউনিয়নের কলা চাষি আব্দুস সুবর মিয়া স্বীকার করেছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কলা চাষে বিষ প্রয়োগ করা হয়। ফল বড়, আকর্ষণীয় ও দ্রুত বাজারজাত করতে কৃষকরা অতিরিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক ব্যবহার করেন। এই কলার দাম বর্তমানে অনেক বেশি, কিন্তু দাম বেশি মানেই নিরাপদ—এমন ধারণা ভ্রান্ত। বরং অনেক ক্ষেত্রে দামি ফল ও সবজিও বেশি রাসায়নিকযুক্ত হতে পারে।
রমজানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফল হলো খেজুর। ইসলামী ঐতিহ্যে খেজুরের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে এবং ইফতারে খেজুর দিয়ে রোযা ভাঙা সুন্নত। বাংলাদেশে খেজুরের উৎপাদন সীমিত হওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ খেজুর আমদানি করতে হয়। ফলে রমজানে খেজুরের চাহিদা ও দাম স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বল্প পরিসরে বাংলাদেশে খেজুর চাষ শুরু হয়েছে, যা একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। যদি এই উদ্যোগ ধারাবাহিকভাবে সম্প্রসারিত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আমদানি নির্ভরতা কমবে এবং সাধারণ মানুষ স্বল্প মূল্যে খেজুর কিনে খেতে পারবে।
তবে বর্তমানে খেজুরের বাজারে তদারকি জোরদার করা জরুরি। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বাজার অস্থিতিশীল করে তোলে। আবার কোথাও কোথাও মেয়াদোত্তীর্ণ ও পচা খেজুরে সরিষার তেল মিশিয়ে চকচকে করে টাটকা খেজুর হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে ক্রেতারা প্রতারিত হচ্ছেন এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। সরকার ও ভোক্তা অধিকার সংস্থাগুলোর উচিত খেজুরসহ সব ধরনের রমজানপণ্যের বাজার মনিটরিং জোরদার করা, যাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা সাধারণ মানুষকে ঠকাতে না পারে।
অতিরিক্ত কীটনাশক, হরমোন ও রাসায়নিক মানবদেহে জমা হয়ে দীর্ঘমেয়াদি মারাত্মক রোগ সৃষ্টি করে। চিকিৎসকদের মতে, এসব রাসায়নিক মানবদেহের হরমোন সিস্টেমকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, প্রজনন ক্ষমতা কমায় এবং শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসার, কিডনি বিকল, লিভার সমস্যা, স্নায়বিক রোগ এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে এসব বিষের প্রভাব আরও ভয়াবহ।
রমজানকে কেন্দ্র করে বাজারে চাহিদা বাড়ে। অনেক সময় সামর্থ্যবানরা প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত বাজার করেন, ফলে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়। এই সুযোগে ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগীরা দাম বাড়িয়ে দেন। এতে নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই রমজানে বাজার করার ক্ষেত্রে সংযম জরুরি। বিত্তবানদের দায়িত্ব আছে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি না করে বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ভূমিকা রাখা।
নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সমাজের বিত্তবান ও সামর্থ্যবান শ্রেণির মানুষদের এগিয়ে আসতে হবে। শুধু দাম বেশি দিয়ে খাদ্য কিনলেই নিরাপদ খাদ্য পাওয়া যাবে—এটি পুরোপুরি সত্য নয়। তাই সামর্থ্যবানরা যদি নিজেদের পরিবারের জন্য হলেও গ্রামের বাড়িতে পতিত জমি ফেলে না রেখে জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করে খাদ্য উৎপাদনের উদ্যোগ নেন, তাহলে নিজের পরিবারের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে এটি দেশের কৃষি ও অর্থনীতির সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা বাড়াবে।
গ্রামাঞ্চলে বিপুল পরিমাণ পতিত জমি পড়ে আছে। এসব জমি পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করে সবজি, ফল, হাঁস-মুরগি ও মাছ চাষ করা গেলে বাজারের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। বিত্তবানদের এই উদ্যোগ গ্রামীণ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সচেতনতা যে পরিবর্তন আনতে পারে, তার বাস্তব উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে। কয়েক বছর আগে ফরমালিনযুক্ত মাছ নিয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি হয়েছিল। গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও সাধারণ মানুষের চাপের কারণে বাজারে ফরমালিন ব্যবহারের প্রবণতা অনেকাংশে কমে আসে। বর্তমানে অধিকাংশ বাজারে অক্সিজেন ব্যবহার করে জীবিত মাছ বিক্রি করা হয়, যা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। এটি প্রমাণ করে—মানুষ সচেতন হলে বাজার, উৎপাদক এবং নীতিনির্ধারকরাও পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়।
নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকারের ভূমিকা অপরিসীম। বাজার তদারকি, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ, কৃষকদের প্রশিক্ষণ এবং জৈব কৃষিতে প্রণোদনা বাড়াতে হবে। সম্প্রতি সরকার রমজান উপলক্ষে ডিম, মাছ, মুরগি ও দুধ স্বল্প বা ভর্তুকি মূল্যে সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছে, যা প্রশংসনীয়। তবে এসব উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত করতে হবে।
এছাড়া অনলাইন বাজারব্যবস্থা চালু করে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। যদি ভোক্তারা অনলাইনে বিভিন্ন পাইকারি বাজারের দরদাম জানতে পারেন, তাহলে বাজারে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং কৃত্রিম সংকট কমবে। একটি ভবনে শত শত মানুষ একসঙ্গে অনলাইনে অর্ডার করলে হোম ডেলিভারি ব্যবস্থাও সহজ হবে। ভবিষ্যতে এই ডিজিটাল বাজারব্যবস্থা বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
রমজান আমাদের সংযম ও শুদ্ধতার শিক্ষা দেয়। খাদ্যের ক্ষেত্রেও এই শুদ্ধতা নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। নিরাপদ খাদ্য শুধু স্বাস্থ্যগত বিষয় নয়, এটি মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নও। বিষাক্ত খাদ্যের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয় দরিদ্র ও সাধারণ মানুষ, যাদের বিকল্প নেই। তাই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তির সম্মিলিত দায়িত্ব।
ভোক্তাদের উচিত সচেতনভাবে কেনাকাটা করা, মৌসুমি ও স্থানীয় ফল-সবজি গ্রহণ করা, খাদ্য ভালোভাবে পরিষ্কার ও প্রক্রিয়াজাত করা এবং সন্দেহজনক পণ্য এড়িয়ে চলা। সরকারের উচিত কৃষকদের প্রশিক্ষণ, জৈব কৃষিতে প্রণোদনা, বাজার তদারকি এবং খাদ্য পরীক্ষাগার সম্প্রসারণ করা। ব্যবসায়ীদের নৈতিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করা জরুরি। বিত্তবানদের উচিত নিজেদের খাদ্য উৎপাদনে সম্পৃক্ত হওয়া এবং বাজারে অতিরিক্ত চাহিদা সৃষ্টি না করা।
রমজান শুধু রোযার মাস নয়, এটি মানবিক দায়িত্বের মাস। আমরা যদি এখনই সচেতন না হই, তাহলে চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিষ খাওয়ার এই ভয়াবহ চক্র চলতেই থাকবে। আসুন, নিজে সচেতন হই, অপরকে সচেতন করি এবং একটি বিষমুক্ত, সুস্থ ও মানবিক সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখি।

এ সম্পর্কিত আরো খবর...

error: Content is protected !!