Tnntv24.অনলাইন ডেক্স:
রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্নাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। তাদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ও তথ্য প্রমাণে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এই রায় দেওয়া হয়েছে।
একইসঙ্গে সোহেল রানাকে পাঁচ লাখ ও স্বপ্নাকে দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
রোববার ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন মামলার সংক্ষিপ্ত রায় পড়ে শোনান। বেলা ১১টায় এজলাসে বসে মামলার রায় পড়া শুরুর পর ১১ টা ৪০ মিনিটে তিনি রায় ঘোষণা করেন।
রায় পড়ার সময় বিচারক বলেন, ‘আসামি সোহেল রানার বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ আনা হয়। এতে ১৬ জন সাক্ষী দেয়। এরপর সাক্ষ্যদের জেরা ও যুক্তিতর্ক সম্পন্ন হয়। আদালতে সাক্ষীদের সাক্ষ্য ও তথ্য থেকে এটা প্রমানিত- বেলা ১১টা ৩০ মিনিট থেকে ১১টা ৪৫ মিনিটের ভেতর শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ঘটে।’
ধর্ষণ আইন অনুযায়ী যদি কোন ব্যক্তি কোন নারী বা শিশুকে তার সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতিরেকে জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে তাহলে সেটা ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হবে।
এই মামলায় সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসক নাসাত জাবিনের সাক্ষ্য ও তথ্যে প্রমানিত হয়, ওই শিশুকে ধর্ষণ ও তার পরে হত্যা করা হয়। এ ছাড়া সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী ও এস আই ইকবালের সাক্ষ্যেও তাদের আসামিদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে।
সোহেল রানার জবানবন্দির বরাতে আদালত জানায়, সোহেল রানা শিশুটিকে বাথরুমে নিয়ে ধর্ষণ করলে অজ্ঞান হয়ে যায় রামিসা। এ সময় বাইরে থেকে লোকজন শিশুটির খোঁজে ডাকাডাকি শুরু করলে তাকে ছুরি দিয়ে হত্যা করে সোহেল এবং মরদেহ গুমের উদ্দেশ্যে শিশুটির মাথা কেটে বালতির ভেতর রাখেন।
বিচারক আরও জানান, আসামি সোহেল রানাকে জোরপূর্বক কিংবা প্রলোভন দেখিয়ে দোষ স্বীকার করানো হয়নি। তিনি নিজেই দোষ স্বীকার করায় তাকে রিমান্ডে নেওয়া হয়নি।
আদালত রায় পর্যালোচনায় জানায়, আসামির জবানবন্দি, তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য ও সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী ডাক্তারের সাক্ষ্য ও প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রমাণিত হয়, আসামি সোহেল রানা দোষী।
অন্যদিকে স্বপ্না খাতুন স্বামীর অপরাধে সহায়তা করেছেন বলে প্রমাণ মিলেছে বলে জানিয়েছে আদালত। ১ নম্বর থেকে ১৬ নম্বর সাক্ষীর সাক্ষ্য অনুযায়ী, তিনি সোহেল রানাকে গ্রি লকেটে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছেন এবং নিজেই স্বীকার করেছেন- ঘটনার সময় তিনি ওই বাসার ভেতরেই ছিলেন।
অর্থাৎ আসামি স্বপ্না আক্তার পর্যাপ্ত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আসামি সোহেলকে হত্যা, ধর্ষণ ও মরদেহ গুমের চেষ্টায় বাধা না দিয়ে এই কাজে সহযোগিতা করেন। ফলে আসামি স্বপ্না আসামি সোহেলের একই অপরাধে অপরাধী।
সব সাক্ষ্য ও তথ্য প্রমানের ভিত্তিতে সার্বিক বিবেচনায় আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্নাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়। একইসঙ্গে সোহেল রানাকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা ও স্বপ্না আক্তারকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
রায় ঘোষণার পর আদালতের কাঠগড়ায় চেয়ারে বসে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন আসামি স্বপ্না আক্তার। তবে নিশ্চুপ দাড়িয়ে ছিলেন সোহেল। রায় ঘোষণার আগেই আদালতের রায় পর্যালোচনার সময় কাঁদতে শুরু করেন স্বপ্না।
মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, রামিসা পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সে ঘর থেকে বের হয়। তখন স্বপ্না তাকে কৌশলে নিজের রুমের ভেতরে নিয়ে যায়। ওই দিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসার মা তাকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে আসামির রুমের সামনে শিশুটির জুতা দেখতে পান তিনি। অনেক ডাকাডাকির পরও কোনো সাড়াশব্দ মেলেনি। পরে রামিসার বাবা-মা ও অন্য ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। তারা আসামির শয়নকক্ষের মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। শিশুটির মাথা রুমের ভেতরে একটি বড় বালতির মধ্যে রাখা ছিল।
জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ থেকে ফোন পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। তারা স্বপ্নাকে হেফাজতে নেয়। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থানার সামনে থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এই ঘটনায় ২০ মে ভুক্তভোগী শিশুর বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা করেন।








