নারায়ণগঞ্জ শনিবার | ৭ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ বসন্তকাল | ১৮ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি
  সর্বশেষ
এ সময়ের জনপ্রিয় ১৫ নায়িকার নাম প্রকাশ করলেন অভিনেতা-উপস্থাপক জয়: Tnntv24
শক্তিশালী কালবৈশাখীর আবাস দিলো কানাডার এক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মোস্তফা কামাল পাশা : Tnntv24
বিচারহীনতার এক নাম ত্বকী হত্যা: করব জিয়ার শেষে দ্রুত বিচার দাবি : Tnntv24
রূপগঞ্জ জনগণের প্রত্যাশা উপজেলা  চেয়ারম্যান হিসাবে অ্যাডভোকেট মাহফুজুর রহমান হুমায়ুনকে দেখতে চান: Tnntv24
রূপগঞ্জে মাদদ্রব্যসহ ৪ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার: Tnntv24
নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর ত্বকী হত্যার ১৩ বছর পূর্ণ , অভিযোগ পত্র না দেয়ায় ক্ষোভ, অদৃশ্য সুতার টানে থমকে আছে : Tnntv24
সোনারগাঁসোনারগাঁয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাঁচ শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ।Tnntv24
নারায়ণগঞ্জে সেলিম মণ্ডল হত্যা মামলায় সাবেক মেয়র আইভীর জামিন নামঞ্জুর : Tnntv24
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনসহ ছয় সিটির প্রশাসক নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রীম কোটের হাইকোর্টে রিট : Tnntv24
বিকেএমইএ’র সভাপতি হাতেম এর ছেলে হাসিন আরমান অয়ন জুলাই আন্দোলনের অংশিদার : Tnntv24
Next
Prev

গল্প: প্রিয়ার আগমন

গল্প: প্রিয়ার আগমন

Facebook
WhatsApp
LinkedIn
গল্প:  প্রিয়ার আগমন

গল্প:

প্রিয়ার আগমন

                                                                                                      নাফিজ আশরাফ

 

ষোড়শ শতাব্দীর শেষ ভাগ। বাংলা তখন এক অস্থির জনপদ। মুঘল সম্রাট আকবরের আগ্রাসী দৃষ্টি এসে পড়েছে ভাটি বাংলার স্বাধীনচেতা জমিদারদের উপর। এই বারো ভূঁইয়াদের অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা ছিলেন মসনদ-ই-আলা ঈশা খাঁ। তার রাজধানী সুবর্ণগ্রাম, যা বর্তমানে সোনারগাঁও নামে পরিচিত, শীতলক্ষ্যা নদীর কূল ঘেঁষে যেন এক দুর্ভেদ্য দুর্গ। চারিদিকে বিস্তৃত জলাভূমি আর অসংখ্য নদী-নালা এই বাংলাকে দিয়েছিল এক প্রাকৃতিক সুরক্ষা, যা ঈশা খাঁর নৌ-বাহিনীকে করে তুলেছিল অপরাজেয়।

ঈশা খাঁ শুধু বীর যোদ্ধাই ছিলেন না, ছিলেন এক দূরদর্শী শাসক এবং মহৎ হৃদয়ের মানুষ। তাঁর প্রথম পত্নীর মৃত্যু তাঁকে এক শূন্যতার গভীরে নিক্ষেপ করেছিল। রাজনীতি আর রণক্ষেত্রের মাঝেও তাঁর মন খুঁজে ফিরত এক অনাবিল শান্তি, এক নিবিড় আশ্রয়। সেই আশ্রয় অপ্রত্যাশিতভাবেই এলো এক পুণ্যস্নান যাত্রায়।

বিক্রমপুরের প্রতাপশালী রাজা চাঁদ রায়ের রূপসী কন্যা ছিলেন স্বর্ণময়ী। বিধবা হওয়ার পর তিনি ধর্মকর্ম এবং নির্জন জীবন বেছে নিয়েছিলেন। একদিন, লাঙ্গলবন্দে পুণ্যস্নান সেরে সখীদের নিয়ে তিনি শীতলক্ষ্যা নদীতে নৌ-বিহারে বের হন। সেই সময়ে আকস্মিক জলদস্যুদের আক্রমণে তিনি অপহৃতা হন। এই জলদস্যুরা ছিল মূলত মগ ও ফিরিঙ্গি, যারা সুযোগ পেলেই ঈশা খাঁর জলসীমায় উপদ্রব করত।ধন-সম্পদ লুটকরাই ছিল ওই দস্যুদের কাজ।

রাজা চাঁদ রায়ের আদরের বিধবা কন্যা স্বর্ণময়ী অপহরণ ঘটনা গুপ্তচর মারফত ঈশা খাঁ খবর পেলেন – তার আওতাভুক্ত নদীপথ থেকে প্রতিবেশী রাজার কন্যা অপহৃত হয়েছেন। এই খবর তার আত্মমর্যাদায় আঘাত হানল। তিনি তখনই দ্রুতগামী বজরা আর চৌকস সৈন্যদল নিয়ে দস্যুদের পিছু ধাওয়া করলেন। রক্তক্ষয়ী এক নৌ-সংঘাতের পর জলদস্যুদের কবল থেকে তিনি স্বর্ণময়ীকে উদ্ধার করলেন।

অপহৃত রাজকন্যাকে তার পিতার কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল ঈশা খাঁ।কিন্তু তিনি ধর্মীয় অনুশাসনে বাধাগ্রস্থ হলেন।বিষয়টি অস্বাভাবিক ছিল, পরিস্থিতি ছিল খুবই জটিল।ভিন্ন গোত্রের হাতে অপহরণ হওয়ায় স্বর্ণময়ী সমাজের চোখে ‘অশুচি’ হয়ে গেছেন।তাই তার পিতৃগৃহে ফেরা অসম্ভব হয়ে উঠল।একদিকে রাজকন্যার চরম অপমান, অন্যদিকে ঈশা খাঁর মানবিক কর্তব্যবোধ—দুইয়ে মিলে এক কঠিন ধাঁধার সৃষ্টি করল।এই দ্বিধার মাঝেই ঈশা খাঁ এক অভাবনীয় সিদ্ধান্ত নিলেন।

তিনি তার বেগম ফাতেমা খান ও ঘনিষ্ঠজনদের সাথে পরামর্শ করে রাজকন্যা স্বর্ণময়ীকে আশ্রয় দিলেন এবং শেষ পর্যন্ত তাকে দ্বিতীয় পত্নী হিসেবে গ্রহণের প্রস্তাব দিলেন। তবে শর্ত ছিল – স্বর্ণময়ীকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে হবে।সেই সময়কার রক্ষণশীল সমাজে এই প্রস্তাব ছিল এক বিশাল পদক্ষেপ। সম্মান রক্ষার এই শেষ আশ্রয়টুকুতে স্বর্ণময়ী ধীরে ধীরে রাজি হলেন।তার নাম পরিবর্তন করে রাখা হলো সোনাবিবি।

স্বর্ণময়ী থেকে সোনাবিবি হয়ে ওঠার এই যাত্রাটি মোটেও সহজ ছিল না। তিনি জানতেন, এই বিবাহ তার পরিবার ও সমাজের কাছে এক চরম আঘাত। প্রথমদিকে সোনারগাঁওয়ের রাজপ্রাসাদে তিনি মন খারাপ করে থাকতেন, এক চাপা বিরহ তাকে ঘিরে রাখত। নদীর পাড়ের এক নির্জন দূর্গে বসে তিনি বহু সময় কেঁদেছেন।আর ঈশা খাঁ সেই দূর্গের নাম রাখলেন সোনাকান্দা। এই নামকরণ ছিল সোনাবিবির প্রতি তার গভীর অনুভূতি ও বেদনাবোধের প্রতিচ্ছবি।

তবে, ঈশা খাঁ তার প্রতি ছিলেন যত্নশীল, প্রেমিক এবং অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এক বিধবা হিন্দু নারীকে মুসলমান সমাজে স্ত্রী হিসেবে মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত যতটা তার ব্যক্তিগত ছিল, ততটাই ছিল রাজনৈতিক ও সামাজিক। তিনি সোনাবিবিকে শুধু স্ত্রী হিসেবে নয়, একজন সম্মানের অধিকারিণী হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।

প্রেমিক ঈশা খাঁ, তার প্রিয়ার আগমনকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে চাইলেন।সেই লক্ষ্যে তার প্রিয় রাজধানী সুবর্ণগ্রাম-এর নাম পরিবর্তন করে রাখলেন সোনারগাঁও। এই নাম শুধু সোনাবিবির রূপকে নয়, তার আত্মত্যাগকে এবং তাদের দুই ভিন্ন ধর্মের মানুষের ভালোবাসাকে বাংলার ইতিহাসে অমর করে রাখল।

সোনারগাঁও তখন নতুন করে সেজে উঠছে। স্থাপত্যে আর লোকনৃত্যে সে এক নতুন প্রাণ পেল। ঈশা খাঁ বড় সরদার বাড়ি নামে একটি জমিদার বাড়ি প্রতিষ্ঠা করলেন, যা ছিল স্থাপত্য শিল্পের এক চমৎকার নিদর্শন। কথিত আছে, সোনাবিবি সেখানে মাঝে মাঝে সময় কাটাতেন।

অন্যদিকে কিশোরগঞ্জের জঙ্গলবাড়ি ছিল ঈশা খাঁর দ্বিতীয় রাজধানী। তিনি সেখানে একটি দুর্গ সংস্কার করেন এবং মসজিদ নির্মাণ করেন। জঙ্গলবাড়ী থেকেও সোনাবিবির কাছে আসতো সোনারগাঁওয়ের নদীর জল আর মাটির সুগন্ধি।

সোনাবিবিও সময়ের সাথে সাথে ঈশা খাঁর উদারতা, সাহস ও গভীর প্রেমে মুগ্ধ হলেন। তিনি দেখলেন, এই বীর পুরুষ শুধু রণক্ষেত্রে নয়, হৃদয়ের যুদ্ধেও জয়ী হতে জানেন। ধীরে ধীরে সেই চাপা বিরহ পরিণত হলো এক গভীর প্রেমে। রাজনৈতিক অস্থিরতা আর যুদ্ধের দামামার মধ্যেও তারা খুঁজে নিলেন এক নিভৃত শান্তির নীড়।

কিন্তু, ভাটি বাংলার মসনদ-ই-আলা-র জীবনে শান্তি ছিল ক্ষণস্থায়ী। মুঘল সম্রাট আকবর বাংলার স্বাধীনতা সহ্য করতে পারছিলেন না। একের পর এক মুঘল সুবাদারকে পাঠানো হলো ঈশা খাঁকে দমন করার জন্য।

প্রথমেই এলেন সুবাদার শাহবাজ খাঁ। পনের শত আশি খ্রিস্টাব্দে তার বিরুদ্ধে কঠিন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন ঈশা খাঁ। কৌশলগত কারণে একবার তিনি পরাজিত হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত সরে গিয়েছিলেন, কিন্তু দ্রুত সৈন্যদল গুছিয়ে তিনি ফিরে এসে জঙ্গলবাড়ীতে শাহবাজ খাঁকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে ভাটি বাংলার কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধার করলেন। সোনাবিবি এই সময় ঈশা খাঁর প্রধান প্রেরণা ছিলেন। তার সাহস, ধৈর্য এবং রাজ্য শাসনের প্রতি তার সহযোগিতা ঈশা খাঁকে নতুন করে শক্তি জুগিয়েছিল।

কিন্তু সবচেয়ে বড় সংঘাত ঘনিয়ে এলো পনের শত সাতানব্বই খ্রিস্টাব্দে, যখন স্বয়ং মুঘলদের সর্বশ্রেষ্ঠ সেনাপতি, রাজা মানসিংহ বিশাল বাহিনী নিয়ে বাংলায় এলেন। এই সংবাদে সোনারগাঁও-এর বুকে নেমে এলো গভীর শঙ্কা। ঈশা খাঁ তার সামরিক ঘাঁটি প্রস্তুত করলেন ব্রহ্মপুত্র নদের পশ্চিম তীরে অবস্থিত এগারোসিন্দুর দুর্গে।

সোনাবিবি জানতেন, এই যুদ্ধ বাংলার ভাগ্য নির্ধারণ করবে। তিনি ঈশা খাঁর যুদ্ধযাত্রার আগে তার কপালে জয়ের তিলক পরিয়ে দেন। অশ্রু সংবরণ করে তিনি স্বামীর হাতে তুলে দেন তার প্রিয় তরবারি, যা ছিল তাদের ভালোবাসার প্রতিশ্রুতির প্রতীক।

ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে শুরু হলো এক ভয়াবহ যুদ্ধ। ঈশা খাঁর সুদক্ষ নৌ-বাহিনী এবং তার গেরিলা যুদ্ধ কৌশল মুঘলদের অপ্রস্তুত করে দিল। যুদ্ধের তৃতীয় দিনে, যখন মুঘল সৈন্যরা দিশেহারা, তখন মানসিংহ আর ঈশা খাঁর মধ্যে এক ঐতিহাসিক দ্বৈত যুদ্ধ শুরু হলো। তরবারির ঝনঝনানি, ঘোড়ার ক্ষুরের আওয়াজ আর সৈন্যদের চিৎকারে প্রকম্পিত হলো এগারোসিন্দুর।

যুদ্ধের এক চরম মুহূর্তে, মানসিংহের তরবারি ভেঙে গেল। পরাজিত সেনাপতিকে আঘাত করা ছিল ঈশা খাঁর জন্য সহজ, কিন্তু তার বীরত্ব ছিল মহৎ। তিনি তৎক্ষণাৎ যুদ্ধ থামিয়ে মানসিংহকে তার দ্বিতীয় তরবারিটি এগিয়ে দিলেন। এই মহত্ত্ব দেখে মানসিংহ মুগ্ধ হলেন। তিনি ঘোড়া থেকে নেমে ঈশা খাঁকে আলিঙ্গন করলেন। যুদ্ধ শেষ হলো, শুধু রণক্লান্তিতে নয়, এক বীরের প্রতি আরেক বীরের শ্রদ্ধায়।

এই ঘটনার পর ঈশা খাঁ মুঘলদের সঙ্গে শর্ত সাপেক্ষে সন্ধি করলেন এবং বাংলায় নিজের স্বাধীনতা বজায় রাখলেন। সম্রাট আকবর তার বীরত্বে সন্তুষ্ট হয়ে তাকে মসনদ-ই-আলা উপাধি প্রদান করেন এবং বাইশ পরগনার শাসক হিসেবে স্বীকৃতি দেন। ঈশা খাঁ সগৌরবে বিজয়ী বেশে সোনারগাঁওয়ে ফিরে এলেন। সোনাবিবির চোখে তখন আনন্দাশ্রু।

কিন্তু, বিধাতা হয়তো মসনদ-ই-আলা ও সোনাবিবির প্রেমকে দীর্ঘস্থায়ী করতে চাননি।পনের শ’ নিরানব্বই খ্রিস্টাব্দে, বাংলার এই মহান বীরের জীবনাবসান হয়। এই মৃত্যু ছিল বাংলার স্বাধীনতা আর সোনাবিবির জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।

ঈশা খাঁ-র মৃত্যুতে শুধু ভাটি বাংলা নয়, সোনাবিবির জীবনের আলোও নিভে গেল। তিনি যেন আবার সেই সোনাকান্দা দূর্গের নির্জনতায় ফিরে গেলেন। তার প্রেম ছিল ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু সেই প্রেমের রেশ অমর।

ঈশা খাঁর মৃত্যুর পর তার পুত্র মুসা খাঁ সোনারগাঁওয়ের মসনদে বসেন এবং এক যুগেরও বেশি সময় ধরে মুঘলদের বিরুদ্ধে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রাম চালিয়ে যান। মুসা খাঁকে সহায়তা করতে সোনাবিবি যেন ঈশা খাঁর রেখে যাওয়া শক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন।

ঈশা খাঁর মৃত্যুর পর সোনাবিবি তার জীবনের বাকি দিনগুলো কাটিয়েছিলেন ধর্মীয় ও সমাজসেবামূলক কাজে। তার নামানুসারে নামকরণ হওয়া সোনারগাঁও আজও দাঁড়িয়ে আছে তাদের অমর প্রেমের সাক্ষী হিসেবে। কিশোরগঞ্জের জঙ্গলবাড়ি দুর্গের অভ্যন্তরে আজও টিকে আছে ঈশা খাঁর দরবার হল, বসত ঘর আর সেই প্রাচীন মসজিদ, যা যুগ যুগ ধরে এই প্রেমের কাহিনীকে বহন করে চলছে।

আজও, যখন শীতলক্ষ্যার জলে সন্ধ্যার আলো পড়ে, তখন শোনা যায় দূর

থেকে ভেসে আসা এক লোকগাঁথা—এক বীর মসনদ-ই-আলার আর তার প্রিয়া সোনাবিবির প্রেমের উপাখ্যান, যেখানে প্রেম, সংঘাত ও বিরহ মিলেমিশে সৃষ্টি করেছে বাংলার এক অমর ইতিহাস।

এ সম্পর্কিত আরো খবর...

error: Content is protected !!