সেলিম ওসমান সন্ত্রাসী,বললেন নারায়ণগঞ্জ-৪
আসনের এমপি আব্দুল্লাহ আল আমিন
Tnntv24.নিজস্ব প্রতিবেদক:
জুলাই শহীদ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেছেন, ‘সেলিম ওসমানও ব্যবসায়ী, সে তো সন্ত্রাসী।’ একইসঙ্গে ব্যবসায়ী সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমকে ওসমানদের ‘ক্যাশিয়ার’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘হাতেমের বিরুদ্ধেও মামলা রয়েছে।’
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) সকালে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ব্যবসায়ী সংগঠন বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমকে ওসমানদের ‘ক্যাশিয়ার’ আখ্যা দিয়ে এমপি আল আমিন বলেন, “যারা শেখ হাসিনার সামনে দাঁড়িয়ে জুলাইকে তাণ্ডব বলেছে, এখন ব্যবসায়ী নেতা বলে হাতেমদের নাম বলা যাবে না? অথচ তারাও জুলাই হত্যা মামলার আসামি। এবং হাতেমের বিরুদ্ধেও মামলা রয়েছে। আমি কখনো কোনো দলের বিরুদ্ধে বলি না। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আমাদের কোনো সমস্যা নেই। তারা এই নারায়ণগঞ্জটাকে টিকিয়ে রাখছে এবং নারায়ণগঞ্জকে বিদেশে সম্মানিত করেছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে কোনো ব্যবসায়ী সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আঁতাত করেনি।”
সেলিম ওসমান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সেলিম ওসমানও ব্যবসায়ী, সে তো সন্ত্রাসী। ফ্যাসিস্টরা অবশ্যই ফ্যাসিস্ট। এই ধরনের বিভাজন করে বলা যাবে না— এরা ভালো, এরা খারাপ। যারা অপরাধ করেছে, তারাই ফ্যাসিস্ট। যখন নারায়ণগঞ্জে আদিলকে গুলি করে হত্যা করা হয়, এরপর শেখ হাসিনার সামনে দাঁড়িয়ে নারায়ণগঞ্জের যে বলছে, ‘এই জুলাই আন্দোলন যারা করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন’, সে এখন ব্যবসায়ী নেতা বলে তাকে স্থান দিতে হবে? এই ধরনের বাংলাদেশ দেখার জন্য আমাদের মায়েদের সন্তানেরা জীবন দেয়নি।”
আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, “আমাদের এখানে বসার কথা ছিল না। টিপু কাকা ছিলেন দৌড়ের ওপর, মইনুদ্দিন আঙ্কেল ওপেন হার্ট সার্জারির রোগী হয়েও কারাগারে ছিলেন। তরিকুল সুজন ভাই মামলায় জর্জরিত ছিলেন। আমাকে এসপি অফিসে নিয়ে গিয়ে ডান হাত ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। আমরা যদি সেই সময় টিকে না থাকতাম, তাহলে আজ এখানে আমাদের নয়, ওসমানদের বসার কথা ছিল।”
জুলাই শহীদদের স্মরণ করে তিনি বলেন, “যাঁদের কারণে আমরা আজ এখানে বসতে পারছি, তাঁদের পরিবারকে এখনো কান্নাকাটি করতে হচ্ছে। তাঁরা এখনো মনে করেন, রাষ্ট্র ও পুরো সিস্টেম তাঁদের প্রতি যে সহমর্মিতা দেখানোর কথা, তা দেখাতে পারছে না। এটি আমাদের জন্য লজ্জার।”
সংসদ সদস্য বলেন, “জুলাই আন্দোলন থেকে উঠে আসা একজন হিসেবে আমি নিয়মিত শহীদ ও আহত পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করি। এবং মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বপ্রাপ্তদের সঙ্গে দেখা করে আহতদের নতুন গেজেট প্রকাশ, ও কবর সংরক্ষণসহ বিভিন্ন জটিলতার বিষয়ে আলোচনা করছি।”
তিনি বলেন, “জেলার চার শহীদের কবর ঢাকা জেলা প্রশাসনের আওতায় হলেও তাঁরা নারায়ণগঞ্জের শহীদ। ফলে সমন্বয়ের অভাবে কেউ দায়িত্ব নিতে চায় না। অথচ এটি শুধু সমন্বয়ের বিষয়। একটি জেলা প্রশাসন দায়িত্ব নিলেই সমস্যার সমাধান সম্ভব।”
জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “স্মৃতিস্তম্ভের চারপাশে ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকে। পুরো জায়গাটিতে একটি স্মৃতিস্তম্ভের পরিবেশ নেই। এখানে দেয়াল, গেট, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে মানুষ মনে করে এটি একটি জাতীয় স্মৃতির স্থান।”
জুলাই গণঅভ্যুত্থানসংক্রান্ত মামলার বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “দেড় শতাধিক মামলা আছে। অন্তত ১০টি মামলা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত তদন্ত ও বিচার শেষ করা যেতে পারে। নারায়ণগঞ্জের অন্তত পাঁচটি মামলাকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এতে শহীদ পরিবার ও আহতদের মধ্যে আস্থা তৈরি হবে।”
মামলায় নিরীহ মানুষকে আসামি করার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “যদি নিরীহ কেউ মামলায় জড়িয়ে থাকে, তদন্ত করে ব্যবস্থা নিন। কিন্তু এভাবে তো বলা যায় না যে নারায়ণগঞ্জে কোনো অপরাধই হয়নি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে এখানে গুলিবর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড হয়েছে। অপরাধীরা অবশ্যই আছে। তাঁদের আইনের আওতায় আনতে হবে।”
তিনি অভিযোগ করেন, “আমরা দেখছি যে নৌকার চেয়ারম্যানেরা, যারা জুলাই গণহত্যার ৫ থেকে ১০টি হত্যা মামলার আসামি, তাদের একদিনও জেল খাটতে হলো না। এবং তারা রাস্তায় হাঁটছে ও জনপ্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে। অন্তত আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নেবে। কিন্তু এখনো অনেক নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রকাশ্যে চেয়ারম্যান পরিচয়ে ঘুরছেন। এটি কীভাবে সম্ভব? আসামিদের প্রশাসন দেখে না, এটি ভুল। কারা নৌকার চেয়ারম্যান ও কারা শামীম ওসমানদের সঙ্গে ছিল, তাদের আমরা চিনি।”
তিনি আরও বলেন, “একটি শহীদ পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, মামলাবাজি ও আসামিদের হুমকির কারণে তাঁদের চাঁদপুরে চলে যেতে হয়েছে। এটি নারায়ণগঞ্জের জন্য লজ্জার।”
শহীদ ও আহত পরিবারের জন্য জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনে একজন করে নির্দিষ্ট কন্টাক্ট পারসন নিয়োগের প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, “যাঁদের হাত নেই, পা নেই, চোখ নেই। তাঁরা এসে কার সঙ্গে কথা বলবেন? একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা থাকলে তাঁরা অন্তত অনুভব করবেন, তাঁদের কথা শোনার কেউ আছে।”
মাদক, সন্ত্রাস ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, “একটি সুন্দর ও ইতিবাচক নারায়ণগঞ্জ গড়তে হলে মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকা এসব সংযোগ বন্ধ করতে হবে। প্রশাসনকে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে।”
তিনি বলেন, “আমরা আন্দোলনের সময় পুরো নারায়ণগঞ্জ অচল করে দেওয়ার ক্ষমতা দেখিয়েছি। এখন আমরা গঠনমূলক রাজনীতি করতে চাই, বিশৃঙ্খলা চাই না। কিন্তু মানুষ যদি প্রশাসনের সদিচ্ছা না দেখে, তাহলে আবার রাজপথে নামবে। তখন সেটা ঠেকানো কঠিন হবে।”
জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে এনসিসি প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান, জেলা পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান মুন্সি, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সিফাত উদ্দিন, সদর উপজেলার সহকারী ভূমি কর্মকর্তা সাদিয়া আক্তার, মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু, মহানগর জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির মাওলানা মঈনুদ্দিন আহমাদ, আমির মাওলানা আবদুল জব্বার, গণসংহতি আন্দোলন জেলার সমন্বয়কারী তারিকুল ইসলাম সুজন, জেলা এনসিপির সাংগঠনিক সম্পাদক নিরব রায়হান, মহানগরীর জাবেদ আলমসহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহতরা উপস্থিত ছিলেন।








