প্রদীপের নীচে অন্ধকার বালু নদীতে
১৭ বাঁশের সাঁকো
Tnntv24.শফিকুল আলম ভুইঁয়া নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
হেলাল মিয়ার দিন শুরু হয় শাক- সবজি ক্ষেতে পরিচর্যার মধ্য দিয়ে। বয়সের ভারে চলা দায় তার, তবু জীবনের তাগিদে নিজের ফলানো সবজি নিয়ে ছুটেন ঢাকার উদ্দেশ্যে। বালুনদীও বাঁশের সাঁকোই তার যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম। দুই বগলে দুটি কাঁচা লাউ চেপে ধরে, থরথর করে কাঁপতে থাকা চার ইঞ্চি চওড়া এক ফালি বাঁশের ওপর পা ফেলেন তিনি।
নিচে কুচকুচে কালো, তীব্র দুর্গন্ধযুক্ত নদীর পানি। একটু পা ফসকালেই অবধারিত মৃত্যু কিংবা পঙ্গুত্ব। এটি যেন প্রদীপের নীচে অন্ধকারের মতোই। ঢাকার পশ্চিমে বালুনদীর তীরে ২৫ টি গ্রামের বাসিন্দাদের এ দুর্ভোগ চির জনমের। এছাড়াও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৭৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাস্তবতার এক ঝলকও এটি।
খাতা-কলমে এই ওয়ার্ডের বাসিন্দারা ‘মেগাসিটি’ ঢাকার অভিজাত এলাকার নাগরিক। এখানকার ২৫টি গ্রামের লাখো মানুষের ভাগ্য আজও ঝুঁলে আছে ১৭ খানা নড়বড়ে বাঁশের সাঁকোতে। রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরত্ব। অথচ এখানকার বাসিন্দারা যেন গত শতাব্দীর কোনো পাতায় আটকে আছে। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও এখানে যাতায়াতের প্রধান বাহন—বাঁশের সাঁকো।
নাগরিক জীবনের সুবিধার স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল প্রতিটি নির্বাচনী ইশতেহারে। স্থানীয় কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেই ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে এই ২০২৬ সালে এসেও যাতায়াতের এই চিত্র সেভাবে বদলায়নি। নড়াই ও দেব ধোলাই নদের ওপর এই বাঁশের সাঁকোগুলোর বয়স প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ বছর। বছরের পর বছর ধরে এক সাঁকো ভেঙে আরেক সাঁকো তোলা হয়। প্রতিটি সাঁকোর গড় দৈর্ঘ্য ১৫০ থেকে ৩০০ ফুট এবং প্রস্থ মাত্র আড়াই থেকে তিন ফুট।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বিশাল অঞ্চল আজ নগরসভ্যতার বাইরে। নগর পাড়া , খামারপাড়া, দেইলপাড়া, কামশাইর, বড়ালু, পাড়াগাও, গৌড়নগর, বাবুর জায়গা, জোরভিটা, লায়নহাটি, বালুরপাড়, ফকিরখালী, ইদেরকান্দি, দাসেরকান্দিসহ প্রায় ২৫টি গ্রামের কয়েক লাখ মানুষের যাতায়াতের পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ১৭টি বাঁশের সাঁকো। প্রতিদিন এই রুট ব্যবহার করে খিলগাঁও, বাসাবো কিংবা মতিঝিলের মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে হয়। হাজার হাজার কর্মজীবী, ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এলাকার মানুষের ট্যাক্সের বোঝা বেড়েছে প্রায় তিন থেকে পাঁচ গুণ। আগে যেখানে ইউনিয়ন পরিষদে নামমাত্র কর নেয়া হতো, এখন সেখানে প্রতিটি পরিবারকে বছরে হাজার হাজার টাকা হোল্ডিং ট্যাক্স গুনতে হচ্ছে। বালু নদীঘেঁষা বালুরপাড় গ্রাম। এ গ্রামের দবির কাজী বলেন, ‘ঢাকায় বাস করেও যেন মনে হয় কোনো দ্বীপে আছি। রাস্তা আছে, কিন্তু সরু, রাস্তার মাঝখানে অনেক বৈদ্যুতিক খুঁটি, ফলে বাঁশের সাঁকোই আমাদের ভরসা।
গৌড়নগর গ্রামের ৭৮ বছর বয়সী আলী মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, ‘কত্তো এমপি আইলো আর গেলো, কেউ সেতু কইরা দেয় না। হগলতে ইলেকশন আইলে কয়, সেতু কইরা দিবো। পরে আর খবর থাহে না।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে ও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই সাঁকোগুলো কোনো সরকারি অনুমোদন নাই।পারাপারের জন্য জনপ্রতি পাঁচ টাকা হারে টোল আদায় করা হয়। সাইকেল বা হালকা মালপত্র থাকলে টোলের পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ টাকা। প্রতিদিন একেকটি সাঁকো থেকে গড়ে তিন থেকে সাত হাজার টাকা পর্যন্ত টোল আদায় হয়। মাসে যার পরিমাণ দাঁড়ায় লাখ টাকার ওপরে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই সাঁকো এখন আর শুধু চলাচলের মাধ্যম নয়, এটি যেন একটি মৃত্যুকূপ। গত পাঁচ বছরে এই সাঁকো পার হতে গিয়ে কিংবা বিনা চিকিৎসায় মারা গেছে
অন্তত ২১ জন মুমূর্ষু রোগী। গত ২০২৪ সালে সাঁকো থেকে পড়ে গৌড়নগর গ্রামের শফি মিয়া (৬৫), মারা যান, ২০২৫ সালে সাঁকো পার হতে গিয়ে ভারসাম্য হারিয়ে ফাতেমা বেগম (১০) পঙ্গুত্ব বরণ করেছে। ২০২৬ সালের গত ছয় মাসে ছোট-বড় অন্তত ৯টি দুর্ঘটনার তথ্য জানা গেছে।
প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বলেন, ‘তৎকালীন সরকার কোনো পরিকল্পনা করেনি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও কোনো পরিকল্পনা ছিল না। একনদীতে ১৭টি বাঁশের সাঁকো, এটা আসলে কেমন জানি দেখায়। সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে দেখি কিছু করা যায় কিনা।








