প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে গেছে বন্ধুত্বের ধরন
“বন্ধু তিন দিন তোর বাড়িত গেলাম, দেখা পাইলাম না”
“বন্ধু তিন দিন তোর বাড়িত গেলাম, দেখা পাইলাম না”
Tnntv24.শফিকুল আলম ভুইঁয়া নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
“তিন দিন তোর বাড়িত গেলাম, দেখা পাইলাম না, আইতে যাইতে বার আনা উশোল হইল না, বন্ধু তিন দিন তোর বাড়িত গেলাম।” ও বন্ধু শুনতে কি পাও এ গান আমার। বিদেশ গিয়ে বন্ধু আমায় ভুল না, চিঠি দিও, পত্র দিও জানাইও ঠিকানা।” এখন আর আগের মত বন্ধুর জন্য এমন আকুতি কেউ করে না। ডাক পিয়নের অপেক্ষায় কোন বন্ধু বান্ধবী বাড়ির পাশে আর দাঁড়িয়ে থাকে না।আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বন্ধুত্বেও ধরন পাল্টে গেছে। হৃদ্যতা এখন হারিয়ে গেছে। মোবাইল ফোন সব কেড়ে নিয়েছে।
ষাটোর্ধ আবুল হোসেন বলেন, একটাই কথা আছে বাংলাতে “বুক আর মুখ বলে এক সাথে সে হল বন্ধু, বন্ধু আমার। বন্ধুর জন্য জীবন বাজি রাখতাম। এক বন্ধুর অসুখ হলে সবাই মিলে দেখতে যেতাম। বন্ধুর সুখে দুখে খোঁজ খবর রাখতাম। আর এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটা স্ট্যাটাস দিয়েই বন্ধুর দায়িত্ব শেষ। দশ জন বন্ধু এক সাথে বসলেও কোন কথা হয় না, সবার চোখ থাকে মোবাইলে। আমরা এক সাথে বসে কত হাসি ঠাট্টার, সুখ দুখের কতই না গল্প করতাম| সব খাইল গো বাজান মোবাইলে”। বন্ধুত্বের আড্ডা এখন শুধুই স্মৃতি।
সারাদিন যে যার কাজে ব্যস্ত থাকার পর বিকেলে খেলার মাঠে, স্কুলের বারান্দায়, বৃক্ষের ছায়ায়, চা কফির দোকানে তরুণের ভিড় বাড়তে থাকে| কারও হাতে চায়ের কাপ, কারও নজর মোবাইল ফোনের রঙিন পর্দায়। নব্বইয়ের দশকের দৃশ্যপট ছিল ভিন্ন।
বিকেল নামলেই গলির মোড়ে বা খেলার মাঠে বাইসাইকেলের চেনা বেল, কিংবা ব্যাকুল হয়ে ডাকপিয়নের পথ চেয়ে বসে থাকার ভেতরে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না। কোনো ভুল বোঝাবুঝি হলে ‘ইনস্ট্যান্ট ব্লক’ বা ‘আনফলো’ করার সুযোগ ছিল না| মন কষাকষি মেটাতে মুখোমুখি দাঁড়াতেই হতো| সেই অপ্রতুলতার যুগে ˆধর্যের শক্তিতেই গড়ে উঠত জীবনভর টিকে থাকার বন্ধন।
প্রযুক্তির অসীম ছোঁয়ায় সেই ছবিটা এখন আমূল বদলে গেছে| মানবসমাজ আজ ইতিহাসের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে সবচেয়ে বড় একাকিত্বের| আড্ডার জায়গা দখল করে নিয়েছে মেসেজিং অ্যাপ, রিলস শেয়ারিং আর সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদম।
আজকের তরুণ প্রজন্মের সামাজিক মাধ্যমের প্রোফাইলে বন্ধুর সংখ্যা শত বা হাজার ছাড়িয়ে যায়| কিন্তু সেই দীর্ঘ তালিকার পেছনে প্রায়ই ঢেকে থাকে এক গভীর নিঃসঙ্গতা| শারীরিক ও মানসিক সংকটের মুহূর্তে পাশে পাওয়ার মতো একজন অকৃত্রিম মানুষ না পাওয়ার অভিজ্ঞতা এখন ঘরে ঘরে| বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে বৃদ্ধি পাওয়া এই একাকিত্বকে একটি গুরুতর জন স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক ও মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকার এই প্রবণতা প্রতিদিন ১৫টি সিগারেট খাওয়ার মতোই শারীরিক স্বাস্হের জন্য ক্ষতিকর।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজের চাপ ও পারিবারিক ব্যস্ততা এসে পড়ে এটা স্বাভাবিক। সেখানে মন খুলে কথা বলার মতো একজন বন্ধু খানিকটা স্বস্তি দেয় । কিন্তু ২০২৬ সালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সোশ্যাল মিডিয়ার অতি-সংযুক্তির দরুণ সেই পরিবর্তন আরও যান্ত্রিক রূপ নিয়েছে।
তবে সময়ের এই পরিবর্তনের সবটুকুই নেতিবাচক নয়। ২০২৬ সালের প্রযুক্তির কল্যাণে নব্বইয়ের দশকের মতো ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে চিরতরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ভয় নেই। সীমানার ওপারে থাকা বন্ধুর সঙ্গে ভিডিও কলে এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলা যায়।
শত শত ফলোয়ারের ভিড়ে হারিয়ে না গিয়ে বহুকাল কথা না-হওয়া পুরোনো বন্ধুকে হঠাৎ ফোন দিয়ে শুধুই জিজ্ঞেস করাু ‘বন্ধু, কেমন আছিস?’
রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক সার্জন ডাঃ অরূপ রতন শাহা বলেন, মোবাইল ফোনে শারিরীক অনেক ক্ষতি করে। তারপরও প্রয়োজনে ব্যবহার করতে হয়| আগে তো মানুষে মানুষে বন্ধু হত, এখন মোবাইলই মানুষের একাকীত্বেও সঙ্গী।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফূল ইসলাম জয় বলেন, যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে প্রযুক্তির প্রয়োজন এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। তবে তা অপব্যবহারও করা যাবে না। প্রযুক্তি বন্ধুত্বের ধরনে পরিবর্তন এনেছে ঠিকই। আবার লক্ষ কোটি মাইল দুরেও বন্ধুত্ব ˆতরি হচ্ছে এ প্রযুক্তির মাধ্যমেই। মোবাইল ফোনে আসক্তি আমাদের একাকীত্ব ˆতৈরি করে। বাচ্চাদের মোবাইল ব্যবহার করতে দেয়া যাবে না। সময় পেলেই বন্ধুত্বের খোঁজ খবর নিতে হবে। অবসর সময়ে প্রাণ খুলে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে হবে। খেলাধুলা করতে হবে। প্রযুক্তিতে মজলে একাকীত্ব জীবনকে গ্রাস করবে।








