জেলায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি: জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর ৯ মাসে
নারায়ণগঞ্জে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত দুই হাজার ৩৮৭ জন
Tnntv24.নিজস্ব প্রতিবেদক:
আজহারুল স্ত্রীর প্রসবের জন্য নারায়ণগঞ্জ জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতালে এসেছিলেন বন্দর কুড়িপাড়া এলাকার বাসিন্দা আজহারুল ইসলাম (৩১)। ভেবেছিলেন, এই সময়ে স্ত্রী ও নবজাতকের পাশে থাকবেন। কিন্তু হাসপাতালে অবস্থানকালেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন তিনি। গত তিন দিন ধরে হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডের বারান্দায় চিকিৎসা নিচ্ছেন আজহারুল।
তার পাশেই মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন শহরের দেওভোগ মাদ্রাসা এলাকার বাসিন্দা মশিউর রহমান। তিনিও তিনদিন ধরে সেখানে চিকিৎসাধীন।
মশিউর রহমান বলেন, ‘ওয়ার্ডে সিট নাই, তাই বারান্দায় মেঝেতে আছি। অসুবিধা হয়, অনেক গরম লাগে। কিন্তু কিছু করার নাই, চিকিৎসা তো করতে হইবো।’
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে আজহারুল ও মশিউরের মতো অন্তত ১০ জন রোগীকে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডের বারান্দা ও মেঝেতে চিকিৎসা নিতে দেখা যায়।
ওয়ার্ডে দায়িত্ব পালনকারী একাধিক নার্স জানান, প্রতিদিনই নতুন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হচ্ছেন। কেউ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন, আবার নতুন রোগী আসছেন। বর্তমানে ২৩ জনের বেশি ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন। প্রয়োজনের তুলনায় শয্যা কম থাকায় অনেক রোগীকে বারান্দা ও মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চলতি সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১৯৩ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আগস্টে এ সংখ্যা ছিল ১১৯ এবং জুলাইয়ে ৩৫ জন। চলতি বছর এখন পর্যন্ত হাসপাতালটিতে ডেঙ্গু আক্রান্ত ৩৭৬ জন চিকিৎসা নিয়েছেন।
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক নাজমুল হাসান বিপুল বলেন, ‘বর্তমানে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। যে পরিমাণ রোগী আসছে, সে পরিমাণ শয্যা আমাদের নেই। তারপরও বারান্দা ও মেঝেতে জায়গা করে গুরুতর রোগীদের ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ৩৭৬ জন ডেঙ্গু রোগীকে আমরা চিকিৎসা দিয়েছি।’
ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার কারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিগত কয়েক বছর ধরে নির্দিষ্ট মৌসুমের বাইরেও মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে। আমাদের মতে, এর একটি বড় কারণ যথাযথভাবে মশারি ব্যবহার না করা। রোগীদের মশারি দেওয়া হলেও অনেকেই ব্যবহার করেন না। এতে আক্রান্ত রোগীকে কামড়ানো মশার মাধ্যমে অন্যদের মধ্যে ডেঙ্গু ছড়ানোর ঝুঁকি থাকে। সাধারণ মানুষের মধ্যেও ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে।’
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নারায়ণগঞ্জে নতুন করে ৩৩ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলায় আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৩৮৭ জন। অথচ ২০২৫ সালের পুরো বছরে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৩৯৮ জন। অর্থাৎ গত বছরের মোট আক্রান্তের সংখ্যার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে চলতি বছরের প্রথম নয় মাসেই।
সরকারি হিসাবে চলতি বছর নারায়ণগঞ্জে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা শূন্য। তবে জেলার কয়েকজন বাসিন্দা রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। নারায়ণগঞ্জের বাইরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হওয়ায় এসব ঘটনা জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের ডেঙ্গুজনিত মৃত্যুর হিসাবে যুক্ত হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ আগস্ট রূপগঞ্জ উপজেলা ভূমি অফিসের চেইনম্যান আবু ছিদ্দিক (৫৮) ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তিনি পরিবার নিয়ে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় বসবাস করতেন।
এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২১ নম্বর ওয়ার্ডের সোনাকান্দা চৌধুরীপাড়া এলাকায় দুই গৃহবধূর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তাদের একজন আশা বেগম। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার পর তাকে প্রথমে নারায়ণগঞ্জের খানপুর হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এলাকায় ডেঙ্গু পরিস্থিতির মধ্যেই এনসিসির মেডিকেল অফিসার ডা. শেখ মোস্তফা আলী নিজেও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। বর্তমানে তিনি বাসায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এনসিসির আরেক মেডিকেল অফিসার ডা. নাফিয়া ইসলাম জানান, সিটি এলাকায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে নিয়মিত মশক নিধন, ওষুধ প্রয়োগ ও সচেতনতামূলক প্রচারণা চলছে। পাশাপাশি অভিযান পরিচালনা করে জরিমানাও করা হচ্ছে।
জেলা সিভিল সার্জন ডা. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘সারাদেশেই মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে। ফলে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপও বেশি। ভিক্টোরিয়া হাসপাতাল ১০০ শয্যার হওয়ায় অতিরিক্ত রোগীদের শয্যা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু এ কারণে চিকিৎসা থেমে থাকতে পারে না। তাই যেভাবে সম্ভব, রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করছি।’
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবাইকে সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধে সাবধানতার বিকল্প নেই। এটি শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে।’








