গল্প:
অন্ধকার সমুদ্রের হাতছানি
-নাফিজ আশরাফ
সুমি শর্মা, নামটা শুনলেই এক ঝলক সতেজ বাতাসের কথা মনে পড়ে। তার পেশা গণমাধ্যম কর্মী, কিন্তু চিরাচরিত সংবাদ পরিবেশনের গণ্ডি পেরিয়ে সে এক অন্য জগতে পদার্পণ করেছে। পঁচিশোর্ধ এই তরুণী, চোখে স্বপ্নআর বুকে উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে ছুটে চলে এক দ্রুত গতির জীবনে। তার ধারালো বুদ্ধি, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেওয়ার দক্ষতা তাকে তার কর্মক্ষেত্রে দ্রুত পরিচিত করে তুলেছে।
এক সন্ধ্যায় এক নামকরা কর্পোরেট পার্টিতে সুমি’র পরিচয় হয় সুস্মিতা সেনের সঙ্গে। সুস্মিতা—গড়ন-পিটোন সুঠাম, পরণে দামি শাড়ি, চোখে আত্মবিশ্বাসের ঝলক। তিনি একজন প্রথম সারির ঠিকাদার ব্যবসায়ী। তার কথা বলার ভঙ্গি, ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা যে কাউকে আকৃষ্ট করতে বাধ্য। গুলশানে তার ছোট্ট কিন্তু রুচিশীল অফিস, যেখানে ঢুকলেই টের পাওয়া যায় পরিচ্ছন্নতা এবং আভিজাত্যের ছোঁয়া। প্রথম আলাপেই তাদের মধ্যে এক অদৃশ্য আকর্ষণ তৈরি হয়। সুমি সুস্মিতার জীবনধারা, আভিজাত্য এবং ক্ষমতার প্রতি মুগ্ধ হয়, আর সুস্মিতা সুমি’র বুদ্ধিমত্তা ও বিশ্বস্ততার আভাস পান।
কিছুদিনের মধ্যেই তাদের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়। তারা প্রায়শই কফি শপে বা সুস্মিতার অফিসে মিলিত হতো। সুস্মিতার জীবন এবং ব্যবসার ভেতরের খবরগুলো ধীরে ধীরে সুমি’র কাছে পরিষ্কার হতে থাকে।
সুস্মিতা সেনের ব্যবসা কেবল ইটের গাঁথনি বা সিমেন্টের স্তূপ নয়; তার ব্যবসার মূল ভিত্তি ছিল এক অলিখিত ‘পলিসি’ বা কৌশল—সরকারের উচ্চ পদস্থ ব্যক্তি, বিশেষত বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবদের হাতে রাখা। তার ব্যবসায়িক সাফল্যের সোপান তৈরি হতো ক্ষমতাধরদের মনোরঞ্জনের মধ্য দিয়ে। “সুমি,” একদিন কফিতে চুমুক দিতে দিতে সুস্মিতা বললেন, “ব্যবসায় টাকাটা আসল নয়, আসল হলো ‘কানেকশন’। আর এই দেশে ‘কানেকশন’ মানে হলো, এদের খুশি রাখা।”
এই ‘খুশি রাখা’-র অর্থ ছিল এলাহি আয়োজন। প্রায়শই সুস্মিতা বড় কোনো চুক্তি বা কাজের আগে এই কর্মকর্তাদের মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা করতেন। রাজধানী থেকে বিমানযোগে কক্সবাজারের মতো বিলাসবহুল গন্তব্যে যাতায়ত, সেখানকার সবচেয়ে উচ্চমানের অত্যাধুনিক হোটেলে থাকা-খাওয়া, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—তাদের কাছে সবচেয়ে সুন্দরী, আকর্ষণীয় মডেল কন্যাদের সরবরাহ করা। এসব কাজ সুস্মিতা বিশ্বস্ত কাউকে ছাড়া দিতেন না। আর সেই বিশ্বস্ততার জায়গাটি ধীরে ধীরে সুমি শর্মা দখল করে নিল।
সুমি’র কাছে বিষয়টা প্রথমে অস্বস্তিকর মনে হলেও, দ্রুতই সে এই জীবনের চাকচিক্য, ক্ষমতা এবং অর্থের মোহে জড়িয়ে পড়ল। সে দেখল, এই কাজগুলোই তাকে অতি অল্প সময়ে এমন এক জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে গণমাধ্যম কর্মী হিসেবে পৌঁছাতে বহু বছর লেগে যেত।
“তুমি বিশ্বস্ত, সুমি। আর তোমার সাংগঠনিক ক্ষমতা অসাধারণ। এইবারের কাজটা তোমার,” সুস্মিতা একদিন সন্ধ্যার ফ্লাইটের টিকিট আর একটি মোটা অঙ্কের অ্যাডভান্স হাতে তুলে দিয়ে বললেন।
এবার সুস্মিতার হাতে ছিল একটি বিশাল সরকারি প্রকল্পের কাজ। তাই আয়োজনটা হতে হতো আরও নিঁখুত, আরও বিলাসবহুল।
পাঁচজন প্রভাবশালী সচিব—যাদের প্রত্যেকের সই মানে শত কোটি টাকার লেনদেন—তাদের নিয়ে চারদিন, চার রাতের এক বিশেষ ভ্রমণের দায়িত্ব পড়ল সুমি শর্মার কাঁধে। গন্তব্য—কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সড়ক সংলগ্ন এক বিশেষ ধরনের হোটেল। সেটি সাধারণ কোনো কটেজ নয়, বরং কাঠের সিঁড়ি দেওয়া, প্রাকৃতিক রূপে নির্মিত, বালুচরের ওপর পাটাতন করা অত্যাধুনিক একটি রিসোর্ট। বাইরের দিকে যত প্রাকৃতিক, ভেতরের দিকে ততটাই বিলাসবহুল—যা নির্জনতা ও আভিজাত্যের এক নিখুঁত সমন্বয়।
যাত্রা শুরু হলো। বিমান বন্দরে সুমি’র পরিপাটি ব্যবস্থাপনা দেখে সচিবরা মুগ্ধ। তারা জানতেন, তাদের জন্য শুধু আরাম নয়, আরও ‘বিশেষ’ কিছু অপেক্ষা করছে। সুমি তাদের প্রত্যেকের পছন্দ ও চাহিদা সম্পর্কে সুস্মিতার কাছ থেকে নোট নিয়ে রেখেছিল।
কক্সবাজারে পৌঁছানোর পর গাড়ি বহর মেরিন ড্রাইভ ধরে ছুটল সেই গোপন রিসোর্টের দিকে। রিসোর্টের নাম ছিল ‘নিঃশব্দ ঢেউ’ (Nishobdo Dhew)।
পাঁচজন মডেল কন্যা প্রস্তুত ছিল। তাদের নির্বাচন সুমি নিজেই করেছিল—সবাই সুন্দরী, স্মার্ট এবং নিজেদের কাজে দক্ষ। রিসোর্টে প্রবেশের পরই শুরু হলো অন্য এক জগৎ। দিনের বেলায় সমুদ্রের নীল জল, বালির চিকচিক আর নীরব প্রকৃতির সান্নিগ্ধ; আর রাতের বেলায় বিলাসবহুল কক্ষ, দামি পানীয় আর নারী সঙ্গ।
প্রথম দুই দিন সবকিছু স্বাভাবিক ছন্দে চলল। সচিবরা নিজেদের মতো করে সময় কাটাচ্ছিলেন। সুমি শুধু দেখভাল করছিল, যাতে কোনো কিছুর অভাব না হয়—খাবার, পানীয়, বা আনুষঙ্গিক কোনো কিছুর।
কিন্তু তৃতীয় রাতে এক ভিন্ন চিত্র দেখা গেল। পাঁচজন সচিবের মধ্যে দুজন ছিলেন অপেক্ষাকৃত তরুণ এবং সতেজ। তারা মডেল কন্যাদের সাথে সমুদ্রের ধারে হেঁটে বেড়ালেন, গান-বাজনার তালে মেতে উঠলেন। কিন্তু বাকি তিনজন ছিলেন যৌবনে ভাটা পড়া, যাদের বয়স প্রায় ষাটের কোঠায়। শারীরিক দুর্বলতা বা বয়সের কারণে তাদের পক্ষে মডেল কন্যাদের ‘পূর্ণ মনোরঞ্জন’ দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না।
কিন্তু মনোরঞ্জন তো হতেই হবে, কারণ সেটাই এই ভ্রমণের আসল উদ্দেশ্য।
সুমি তার মডেল কন্যাদের নিয়ে একটা গোপন মিটিং করল। “তোমাদের উদ্দেশ্য শুধু শারীরিক নয়, মানসিক প্রশান্তিও,” সুমি বোঝালো, “তারা ক্ষমতাধর মানুষ, তাদের ইগোকে সন্তুষ্ট করতে হবে। যার যেমন দরকার, তাকে তেমনই দাও। কেউ যদি শুধু গল্পে বা মানসিক সঙ্গতে খুশি হয়, সেটাই দাও। কেউ যদি তার ক্ষমতা জাহির করতে চায়, তাকে সেই সুযোগ দাও। মনে রেখো, তাদের সন্তুষ্টিই আমাদের সাফল্য।”
মডেল কন্যারাও ছিল পেশাদার। তারা তাদের কৌশল পাল্টালো। এক জন সচিব, যিনি বই পড়তে এবং পুরনো দিনের গান শুনতে পছন্দ করতেন, তার জন্য মডেল কন্যাটি রাতে শুধু পাশে বসে রবীন্দ্রসংগীত শোনালো এবং বিভিন্ন দার্শনিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করল। আরেকজন বয়স্ক সচিব, যিনি প্রচুর প্রশংসা শুনতে পছন্দ করতেন এবং নিজেকে একজন ‘বিরাট ব্যক্তিত্ব’ হিসেবে প্রমাণ করতে চাইতেন, মডেল কন্যাটি তার অফিসের সাফল্যের গল্পগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনল এবং মাঝে মাঝে আবেগাপ্লুত হয়ে তার ‘মেধা ও ক্ষমতা’র প্রশংসা করল।
কেউ কেউ শুধু নিজেদের জীবনের ব্যর্থতা, একাকীত্ব ও ক্ষমতার ক্ষণস্থায়ীত্ব নিয়ে কথা বলে হালকা হতে চাইলেন, মডেল কন্যারা ধৈর্য ধরে তাদের সেই মানসিক শূন্যতা পূরণ করল—একজন ভালো শ্রোতা হয়ে।
এই কৌশলটা দারুণ কাজ করল। সচিবরা শুধু দৈহিক সুখ নয়, একধরনের মানসিক আশ্রয় খুঁজে পেলেন। তারা অনুভব করলেন, এই তরুণীরা তাদের ক্ষমতার স্তুতি করছে, তাদের একাকীত্বে সঙ্গ দিচ্ছে। এটাই ছিল সুমি’র ব্যবস্থাপনার শৈল্পিক দিক।
চার দিন, চার রাত পর। বিমানবন্দর থেকে বিদায় জানানোর সময় সচিবদের চোখে-মুখে ছিল এক গভীর সন্তুষ্টির ছাপ। তারা সুমি শর্মার দক্ষতা ও ব্যবস্থাপনার ভূয়সী প্রশংসা করলেন। একজন প্রবীণ সচিব, যাওয়ার আগে সুমি’র কাঁধে হাত রেখে বললেন, “সুস্মিতা সেন একজন অসাধারণ ব্যবসায়িক অংশীদার, কিন্তু তুমি, সুমি, একজন অসাধারণ সংগঠক। ভবিষ্যতে তোমার উজ্জ্বল সম্ভাবনা।”
রাজধানীতে ফিরে সুমি সোজা সুস্মিতার অফিসে গেল। সুস্মিতা এক বিশাল অঙ্কের চেক সুমি’র হাতে তুলে দিলেন। “তুমি প্রমাণ করেছ, তুমি কতটা যোগ্য,” সুস্মিতা হাসিমুখে বললেন।
গভীর রাতে নিজের ফ্ল্যাটের বিশাল বারান্দায় দাঁড়িয়ে সুমি শর্মা। হাতে পানীয়ের গ্লাস, সামনে রাজধানীর আলোর ঝলকানি। অ্যাকাউন্টে জমা হওয়া বিপুল অর্থটা যেন এক সাময়িক সুখ। সে এক অন্ধকার সমুদ্রের তীরে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে ঢেউয়ের শব্দে ভেসে আসছে ক্ষমতা, অর্থ আর গোপন মনোরঞ্জনের ফিসফাস।
সে জানে, এই পথ সহজ নয়, এই আলোর নিচে লুকানো আছে অনেক অন্ধকার। সে এখন আর শুধু একজন গণমাধ্যম কর্মী নয়; সে ক্ষমতা আর টাকার খেলার এক অপরিহার্য ‘অপারেটর’।
সুমি গ্লাসে চুমুক দিল। আকাশের দিকে তাকালো, যেখানে অসংখ্য তারা। সে ভাবল, “এই রাতের আকাশেও আলো আছে, আবার আছে গভীর শূন্যতা। আমার জীবনটাও আজ ঠিক তেমনই।”
সুমি শর্মা নিজেকে প্রশ্ন করল—তার এই ‘সাফল্য’ কি সত্যি কোনো নান্দনিকতা বহন করে, নাকি এটা কেবল ক্ষমতার খেলায় নৈতিকতার বলিদান? উত্তরটা সেদিনের মতো না খুঁজে সে বারান্দা ছেড়ে ঘরের দিকে হাঁটা দিল। আগামীকাল আরও নতুন কোনো মনোরঞ্জনের গোপন আয়োজন, আরও নতুন কোনো অন্ধকার সমুদ্রের হাতছানি তাকে ডাকছে। আর সুমি জানে, সেই ডাকে সাড়া দিতেই হবে।








