অণুগল্প :
প্রথম বেতন
জাহাঙ্গীর ডালিম
মা! মা, কোথায় তুমি?”
মাসুদের গলার আওয়াজে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন মা। তার হাতে ধরা প্রথম বেতনের খামটা মায়ের হাতে দিয়ে মাসুদ বললো,
“এই নাও, মা। আমার জীবনের প্রথম উপার্জন। আজ থেকে আমাদের আর কোনো কষ্ট থাকবে না।”
ছেলের কথা শুনে মায়ের চোখে জল চলে এলো। তিনি খামটা হাতে নিলেন, কিন্তু তার মুখটা আনন্দে উজ্জ্বল হওয়ার বদলে কেমন যেন ম্লান হয়ে গেলো। তিনি কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন,
“মাসুদ, এই খামের সবটা টাকাই কি আমাকে দিয়ে দিবি?”
“অবশ্যই, মা! সবটাই তোমার।”
“তাহলে আমার একটা শেষ অনুরোধ রাখবি, বাবা?”
“কী অনুরোধ, মা?”
“এই টাকাটা তুই কাল সকালে আমাদের পাশের বাড়ির করিম চাচাকে দিয়ে আসবি?”
মায়ের কথা শুনে মাসুদের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো।
“করিম চাচাকে? কেনো? যে লোকটা আমাদের বিপদের সময় কোনোদিনও এক মুঠো চাল দিয়েও সাহায্য করেনি, তাকে আমি আমার প্রথম বেতনের সব টাকা দিয়ে দেবো? অসম্ভব!”
“বাবা, তর্ক করিস না। আমি যা বলেছি, তাই কর।”
“না, মা! আমি পারবো না। এই টাকার ওপর আমার আর তোমার হক। অন্য কারো নয়।”
“তুই দিবি।”
মায়ের কণ্ঠস্বরটা এবার কঠোর শোনালো।
“তোকে এটা দিতেই হবে।”
মায়ের এমন অদ্ভুত, জেদি আচরণে মাসুদ হতভম্ব এবং প্রচণ্ড দুঃখ পেলো। সে সারা রাত ঘুমাতে পারলো না। যে মায়ের মুখে হাসি দেখার জন্য সে এতো কষ্ট করেছে, সেই মা-ই তার প্রথম আনন্দটা এভাবে নষ্ট করে দিচ্ছেন!
পরদিন সকালে, ভারী মন নিয়ে মাসুদ তার প্রথম বেতনের টাকাটা নিয়ে গেলো করিম চাচার বাড়ি। করিম চাচা তাকে দেখে অবাক হলেন। মাসুদ কোনো কথা না বলে টাকাটা তার হাতে দিয়ে বললো,
“মা পাঠিয়েছেন।”
করিম চাচা টাকাটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন। তারপর কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তিনি মাসুদের হাতটা ধরে বললেন,
“আমি জানতাম, তোমার মা কোনোদিনও তার কথা ভুলবেন না।”
মাসুদ অবাক হয়ে বললো,
“কীসের কথা, চাচা?”

করিম চাচা চোখের জল মুছতে মুছতে বললেন,
“আজ থেকে পনেরো বছর আগে, তোর বাবা যখন মারা গেলেন, তখন তোর হার্টের অপারেশনের জন্য পাঁচ হাজার টাকা দরকার ছিলো। আমি তখন আমার স্ত্রীর কানের দুল বিক্রি করে তোদের টাকাটা ধার দিয়েছিলাম। তোর মা বলেছিলো, ‘আমার ছেলে যেদিন প্রথম উপার্জন করবে, সেই উপার্জনের প্রতিটি পয়সা দিয়ে আমি আপনার এই ঋণ শোধ করবো’।”
“আমি তো কবেই সেই টাকার কথা ভুলে গেছি, বাবা। কিন্তু তোমার মা ভোলেননি। তিনি গতো পনেরোটা বছর ধরে এই একটা দিনের অপেক্ষায় ছিলেন।”
করিম চাচার কথাগুলো শোনার পর মাসুদের পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গেলো। সে দৌড়ে বাড়ি ফিরলো। দেখলো, তার মা জায়নামাজে বসে নিঃশব্দে কাঁদছেন।
সে তার মায়ের পাশে গিয়ে বসলো। তার মা, যিনি কি না নিজের ছেলের প্রথম উপার্জনের টাকাটা ছুঁয়েও দেখেননি, শুধু একটা পুরোনো ঋণ শোধ করার জন্য। মাসুদ বুঝতে পারলো, তার মা তাকে শুধু জন্মই দেননি, সততা আর কৃতজ্ঞতার এক বিশাল পৃথিবীর সাথেও আজ পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।








