নারায়ণগঞ্জ শনিবার | ৭ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ বসন্তকাল | ১৮ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি
  সর্বশেষ
এ সময়ের জনপ্রিয় ১৫ নায়িকার নাম প্রকাশ করলেন অভিনেতা-উপস্থাপক জয়: Tnntv24
শক্তিশালী কালবৈশাখীর আবাস দিলো কানাডার এক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মোস্তফা কামাল পাশা : Tnntv24
বিচারহীনতার এক নাম ত্বকী হত্যা: করব জিয়ার শেষে দ্রুত বিচার দাবি : Tnntv24
রূপগঞ্জ জনগণের প্রত্যাশা উপজেলা  চেয়ারম্যান হিসাবে অ্যাডভোকেট মাহফুজুর রহমান হুমায়ুনকে দেখতে চান: Tnntv24
রূপগঞ্জে মাদদ্রব্যসহ ৪ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার: Tnntv24
নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর ত্বকী হত্যার ১৩ বছর পূর্ণ , অভিযোগ পত্র না দেয়ায় ক্ষোভ, অদৃশ্য সুতার টানে থমকে আছে : Tnntv24
সোনারগাঁসোনারগাঁয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাঁচ শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ।Tnntv24
নারায়ণগঞ্জে সেলিম মণ্ডল হত্যা মামলায় সাবেক মেয়র আইভীর জামিন নামঞ্জুর : Tnntv24
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনসহ ছয় সিটির প্রশাসক নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রীম কোটের হাইকোর্টে রিট : Tnntv24
বিকেএমইএ’র সভাপতি হাতেম এর ছেলে হাসিন আরমান অয়ন জুলাই আন্দোলনের অংশিদার : Tnntv24
Next
Prev

গল্প: সংগ্রামী লেন্স- নাফিজ আশরাফ

গল্প: সংগ্রামী লেন্স- নাফিজ আশরাফ

Facebook
WhatsApp
LinkedIn
গল্প: সংগ্রামী লেন্স- নাফিজ আশরাফ

সংগ্রামী লেন্স

নাফিজ আশরাফ

কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারা উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামটি তখনো আধুনিকতার স্পর্শ থেকে অনেক দূরে। মাটির সোঁদা গন্ধ, দিগন্তজোড়া ধানখেত আর সন্ধ্যা-সকালের আজান ধ্বনিতে মুখরিত ছিল সেই জনপদ। এই গ্রামেই কৃষক আবেদ আলীর সংসার। তিনি ধর্মপ্রাণ মুসলিম, জীবন চলত কঠোর অনুশাসন আর সরল বিশ্বাসে। তাঁর ছোট ভাই মমিন উদ্দিন স্থানীয় মাদ্রাসার শিক্ষক। ফলে পরিবারে ধর্মীয় গোঁড়ামি আর অনুশাসন ছিল খুব প্রবল।

আবেদ আলীর একমাত্র কন্যা শামীমা। বাল্যকাল থেকেই সে অন্যরকম। মাদ্রাসা শিক্ষায় তার হাতেখড়ি, পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সেখানেই পড়েছে। বাবা-চাচার একান্ত ইচ্ছা, শামীমা আলেমা হবে, মাদ্রাসার চার দেয়ালেই তার জীবন কাটবে। কিন্তু শামীমার কচি মনের জগৎটা ছিল বিস্তৃত আকাশের মতো। মাদ্রাসার সীমিত জ্ঞান তাকে মুক্তি দিতে পারল না। সে চাইত বাইরের পৃথিবীকে দেখতে, জানতে। তার মন বিদ্রোহ করে উঠল। আমি স্কুলে পড়ব,” শামীমার এই একরোখা দাবি প্রথমে পরিবারে ঝড় তুলল। আবেদ আলী কঠিনভাবে আপত্তি জানালেন, কিন্তু শামীমার মায়ের নীরব সমর্থন এবং শামীমার দৃঢ়তা শেষ পর্যন্ত জয়ী হলো।

ভর্তি হলো দূরের এক হাই স্কুলে। স্কুল যাওয়ার পথটুকু ছিল শামীমার জন্য যেন এক আর্ট গ্যালারি। ধানখেতের আল ধরে রোজ হাঁটা। সূর্যের প্রথম আলোয় শিশিরবিন্দু মুক্তোর মতো চিকচিক করত, দুপুরে রাখালের বাঁশির সুর ভেসে আসত আর সন্ধ্যার আবছা আলোয় ঘরে ফেরা কৃষকের মুখে ফুটে উঠত ক্লান্তি ও শান্তির এক অদ্ভুত মিশ্রণ। এই দৃশ্যগুলো তার হৃদয়ে ছবির মতো আঁকা হতো। সে অনুভব করত, এই মুহূর্তগুলো ধরে রাখার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা। তখনই তার হৃদয়ে ফটোগ্রাফির স্বপ্ন জন্ম নেয়। হাতে ক্যামেরা না থাকলেও, তার চোখ ছিল এক নীরব লেন্স। সে ভাবত, যদি এগুলো সে ধরে রাখতে পারত, তাহলে হয়তো এই নিরবে হারিয়ে যাওয়া সৌন্দর্য আর সংগ্রামকে বাঁচিয়ে রাখা যেত।

হাইস্কুলের গণ্ডি পেরোতেই আবার এলো বাধা। গ্রামে কলেজ নেই, শহরে যেতে হবে। মেয়ের শহর যাওয়া, আধুনিক পরিবেশে মেশা—এগুলো আবেদ আলীর কাছে ছিল কল্পনার অতীত। কিন্তু শামীমার ভেতরের আগুন তখন তীব্র। সে স্পষ্ট বুঝিয়ে দিল, এই চার দেয়ালের জীবন তার নয়। দীর্ঘদিনের জেদ আর অনশনের পর অবশেষে পরিবার হার মানল। শামীমা কুষ্টিয়া শহরে কলেজে ভর্তি হলো। এই প্রথম সে এক আধুনিক, উন্মুক্ত পরিবেশের সংস্পর্শে এলো। গ্রামের কঠোর ধর্মীয় জীবন থেকে বেরিয়ে এসে সে যেন নতুন করে শ্বাস নিল।

শহরে এসে তার জীবনের লক্ষ্য আরও স্পষ্ট হলো। সে বুঝতে পারল, তার স্বপ্ন শুধু ছবি তোলা নয়, বরং উপরে ওঠার সংগ্রামী জীবন বেছে নেওয়া। কলেজে দ্রুতই এক সমমনা বন্ধু-সার্কেল গড়ে উঠল। তাদের সহায়তায় শামীমা একটা পুরনো স্মার্টফোন জোগাড় করল। সেই ফোন দিয়েই শুরু হলো তার ফটোগ্রাফির প্রথম পাঠ। ক্যামেরা বলতে তখনো মোবাইল লেন্স, কিন্তু তার ফ্রেমিং, আলো-ছায়া ব্যবহারের ক্ষমতা ছিল সহজাত। সে ধারণ করতে শুরু করল গ্রামের মানুষের সুখ-দুঃখ, বেদনা এবং নান্দনিক জীবনের ছবি। তার লেন্স হয়ে উঠল প্রান্তিক মানুষের নীরব কণ্ঠস্বর। বিশেষ করে, গ্রামের অসহায় নারী ও শিশুদের জীবন সংগ্রাম ছিল তার ছবির প্রধান বিষয়।

তবে শামীমার স্বপ্ন ছিল আরও বড়। তার লক্ষ্য ছিল দেশের সেরা বিদ্যাপীঠ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। উচ্চমাধ্যমিকের ফল প্রকাশের পর সে প্রমাণ করল, ধর্মীয় গোঁড়ামি বা দারিদ্র্য তার মেধার পথে বাধা হতে পারেনি। সে সুযোগ পেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে। গ্রামের শান্ত পরিবেশ ছেড়ে সে প্রবেশ করল এক বিশাল, আধুনিক এবং একইসঙ্গে উত্তাল জগতে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি যেন ছিল রাজনীতি, আন্দোলন এবং স্বপ্নের কেন্দ্র। শামীমা দেখল, তার চারপাশে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলন, মিছিল, দাঙ্গা-হাঙ্গামা চলছে। রাজধানী ঢাকার প্রতিটি মোড় যেন প্রতিবাদের মঞ্চ। তার হাতে তখন একটি পুরনো ডিএসএলআর ক্যামেরা। ফটোগ্রাফির স্বপ্ন এবার জীবনের এক কঠিন বাস্তবতায় মোড় নিল—সে হতে চাইল ফটো জার্নালিস্ট। সে বুঝতে পারল, তার ক্যামেরার শক্তি দিয়ে সে শুধু সৌন্দর্য নয়, সমাজের অসঙ্গতি আর সংগ্রামকেও তুলে ধরতে পারবে।

একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে এক তীব্র রাজনৈতিক সংঘর্ষ চলছে। পরিস্থিতি ভয়াবহ—পুলিশি ধাওয়া, লাঠিচার্জ, টিয়ারসেল নিক্ষেপ। শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে এদিক-ওদিক পালাচ্ছে। শামীমা সেই ভিড়ের মধ্যে। হঠাৎ সে দেখল, এক আন্দোলনকারী কর্মীকে প্রতিপক্ষ নির্মমভাবে পিটিয়ে মাটিতে ফেলে আরও পেটাচ্ছে। সাধারণ মানুষ ভয়ে পিছিয়ে গেলেও, শামীমা এক চুল নড়ল না। জীবনের কঠিন ঝুঁকি নিয়ে সে এগিয়ে গেল। টিয়ারসেলের ধোঁয়া আর লাঠির আঘাত উপেক্ষা করে সে নিখুঁত ফ্রেমে সেই বীভৎস দৃশ্যটি ক্যামেরাবন্দি করল। তার ভেতরের পেশাদারিত্ব তাকে জীবনের নিরাপত্তার চেয়ে সত্যকে প্রকাশ করার তাড়না দিল।

এই উত্তাল পরিবেশেই শামীমা তার স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাচ্ছিল। গত কয়েক দিন ধরে আলমগীর রহমান নামের একজন প্রখ্যাত সিনিয়র ফটো জার্নালিস্ট তাকে দেখছিলেন। আলমগীর দেশের একটি নামকরা ইংরেজি দৈনিকের চিফ ফটো এডিটর। তিনি লক্ষ্য করেন, একটি ছিপছিপে, পাতলা মেয়ে, যার চোখে ভয়ের লেশমাত্র নেই, সে একাই ক্যামেরা হাতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে দাঁড়িয়ে কাজ করছে। তার ছবিতে ছিল এক অসাধারণ ডেপথ এবং স্টোরি বলার ক্ষমতা। কৌতূহলবশত তিনি শামীমাকে অনুসরণ করলেন।

সংঘর্ষ শেষে এক নিরিবিলি কোণে আলমগীর শামীমার সাথে পরিচয় ঘটালেন। “আপা, তুমি এভাবে একা রিক্স নিয়ে কাজ করছো? ছবিগুলো দেখতে পারি?” আলমগীরের কণ্ঠে ছিল মুগ্ধতা। শামীমা ইতস্তত করে তার ক্যামেরাটি এগিয়ে দিল। আলমগীর মনোযোগ দিয়ে তার তোলা ছবিগুলো দেখতে লাগলেন—বিশেষ করে সেই মারধরের দৃশ্যটি, যা অন্য কোনো ক্যামেরায় ধরা পড়েনি।

“অসাধারণ! তোমার সাহসের যেমন তারিফ করতে হয়, তেমনি তোমার ফ্রেমিংও দারুণ। তুমি তো দেখছি জন্মগত ফটো জার্নালিস্ট,” আলমগীর বললেন। শামীমা তখন তার জীবনের গল্পটা সংক্ষেপে বললেন—গ্রামের গোঁড়ামি, পরিবারের বাধা, ক্যামেরা কেনার জন্য টিউশনির টাকা জমানো—সবকিছু।

আলমগীর বুঝলেন, শামীমার এই সাহস শুধু আবেগের ফল নয়, বরং প্রতিকূলতা পেরিয়ে আসার এক দৃঢ় মানসিকতার প্রতিফলন। তিনি শামীমার ধর্মীয় গোঁড়ামি উপেক্ষা করে সংগামী জীবন বেছে নেওয়ার বিস্তারিত জেনে তাকে মুগ্ধ হলেন। “তোমার ভেতরের আগুনটা আমি দেখতে পাচ্ছি, শামীমা। তোমার এই সাহসকে কাজে লাগাতে হবে। তোমার ছবিগুলো দেশের মানুষের দেখা উচিত,” আলমগীর বললেন। তিনি কালবিলম্ব না করে শামীমাকে তার সম্পাদিত নামকরা ইংরেজি দৈনিকে শিক্ষানবিশ হিসেবে চাকরির ব্যবস্থা করে দিলেন। শামীমার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্নটা যেন হাতের মুঠোয় এলো।

 

সাংবাদিকতার এই কঠিন পথে নামার আগেই, শামীমার জীবনে এসেছিল আরও এক আলোর রেখা—প্রেম। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার পরিচয় হয় আফনান মাহমুদ-এর সাথে। আফনান তার চেয়ে দু’বছরের সিনিয়র, অর্থনীতি বিভাগের অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিবেটিং ক্লাবের পরিচিত মুখ। আফনান শুধু মেধাবীই নন, তিনি ছিলেন প্রগতিশীল চিন্তাধারার এক তরুণ।

প্রথমদিকে বন্ধুত্ব। ক্লাস শেষে কফি শপে দীর্ঘ আলোচনা হতো তাদের। শামীমা বলত গ্রামের কথা, ফটোগ্রাফির স্বপ্নের কথা। আফনান মুগ্ধ হয়ে শুনতেন শামীমার দৃঢ়তা আর সংঘাতপূর্ণ জীবনযাত্রার গল্প। আফনান নিজে প্রচণ্ড বাস্তববাদী ও যুক্তিবাদী হওয়ায় শামীমার ভেতরের গোঁড়ামি ভাঙার চেষ্টাটিকে সবসময় সমর্থন করতেন। ধীরে ধীরে তাদের সম্পর্ক গভীর হলো।

আফনান শুধু শামীমার প্রেমিক ছিলেন না, ছিলেন তার সর্বক্ষণের অনুপ্রেরণা এবং কঠিন সময়ের নির্ভরতা। যখন শামীমার পরিবার তাকে সাংবাদিকতা নিয়ে চাপ দিত, তখন আফনান তাকে সাহস যোগাতেন। “তুমি প্রমাণ করে দেখাও, শামীমা। তোমার কাজই তোমার জবাব দেবে,” আফনান বলতেন। শামীমার ঝুঁকিপূর্ণ জার্নালিজম কাজের সময় আফনান সবসময় তাকে সতর্ক করতেন এবং মানসিক সমর্থন দিতেন। তাদের প্রেম ছিল প্রচলিত প্রেমের সংজ্ঞা থেকে ভিন্ন—এটি ছিল দু’জন সংগ্রামী মানুষের একে অপরের প্রতি বিশ্বাস, সম্মান এবং স্বপ্নের প্রতি অঙ্গীকারের বন্ধন।

যখন শামীমা ইংরেজি দৈনিকে চাকরি পেল, আফনানই ছিলেন সবচেয়ে বেশি উচ্ছ্বসিত। তার কাছে শামীমার এই অর্জন ছিল গোঁড়া সমাজের প্রতি এক নীরব প্রতিবাদ। রাতের পর রাত দুজনে মিলে শামীমার ছবির স্টোরিলাইন তৈরি করত।

শামীমা এখন পূর্ণাঙ্গ ফটো জার্নালিস্ট। একদিকে পেশাগত জীবনের তীব্র চ্যালেঞ্জ—প্রতিদিন নতুন ঘটনার সন্ধানে ছুটে চলা, জীবনের ঝুঁকি নেওয়া; অন্যদিকে ব্যক্তিগত জীবনে আফনানের গভীর ও প্রগতিশীল প্রেম। গ্রামের সেই ধর্মীয় কঠোরতার বেড়াজাল ছিন্ন করে শামীমা এখন শুধু একজন মুক্ত নারী নন, সে সমাজের চোখে সত্য তুলে ধরার এক সাহসী লেন্স, আলোর পথে এক সংগ্রামী লেন্স। তার লেন্স দিয়ে শুধু ছবি নয়, শামীমা যেন তার সংগ্রামী জীবনের গল্পই বুনছে।

এ সম্পর্কিত আরো খবর...

error: Content is protected !!