রূপগঞ্জে বিদ্যুতের অবৈধ লাইন:
ঝুঁকিপূর্ণ কয়েক হাজার মানুষের জীবন
Tnntv24.শফিকুল আলম ভূইয়া নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের কেশরাব গ্রামের ওপর দিয়ে একটি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের (কাঞ্চন পূর্বাচল পাওয়ার জেনারেশন লিঃ) হাইভোল্টেজ লাইন নির্মাণ করা হয়েছে। স্বল্প উচ্চতায় থাকা অরক্ষিত ৩৩ কেভি লাইনের ফ্ল্যাশিংয়ের কারণে এলাকায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে।
সবশেষ গত ২৭ মে ঈদের আগের দিন বিদ্যুতের আগুনে ঝলসে যান আরিফ নামে এক স্থানীয় দোকানদার। বর্তমানে তিনি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পূর্বাচলে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলা হয়। কাঞ্চন পূর্বাচল পাওয়ার জেনারেশন লিঃ-এর ৫৫ মেগাওয়াট প্রকল্পটির জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য নির্মিত লাইনটি নির্ধারিত রুট ব্যবহার না করে কেশরাব গ্রামের ওপর দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। জনগণের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও তৎকালীন প্রভাবশালী মহলের ইচ্ছায় জনগণকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অবৈধভাবে লাইনটি নির্মাণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
বিদ্যুৎ লাইনটি চালু হওয়ার পর থেকে প্রায় শতাধিক দুর্ঘটনায় গ্রামের সাধারণ মানুষের বাড়িঘরের বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি পুড়ে যাওয়া, বসতবাড়িতে আগুন লাগা, হাইভোল্টেজ কারেন্টের শর্ট সার্কিটে খামারের গরু মারা যাওয়া এবং পুকুরের মাছ মারা যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে বলে জানান এলাকাবাসী।
অতি সম্প্রতি গ্রামের এক দোকানদার আরিফের ওপর হাইভোল্টেজ কারেন্টের ফ্ল্যাশিংয়ের ফলে তিনি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় দগ্ধ হন। তাঁর শরীরের বড় একটি অংশ আগুনে পুড়ে যায়। এলাকাবাসীর মতে, ঘটনাটি উক্ত লাইনের ভয়াবহতারই প্রতিচ্ছবি।
সরেজমিনে কেশরাব গ্রামে গিয়ে এলাকাবাসীর অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। বিদ্যুৎকেন্দ্রের উচ্চ ভোল্টেজ লাইনের সংযোগ পোলের নিচেই পল্লী বিদ্যুতের আরেকটি সরবরাহ লাইন ও ট্রান্সফরমার রয়েছে। এছাড়া ওই লাইনের নিচ দিয়ে পাকা সড়ক ধরে প্রতিদিন কয়েকটি গ্রামের হাজার হাজার মানুষ চলাচল করে।
এলাকাবাসীর দাবি, বিদ্যুৎ লাইনটি নির্মাণের সময় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা মানা হয়নি। পুরো লাইনের কোথাও কোনো পোলেই গ্রাউন্ডিং করা হয়নি। হাইভোল্টেজ শর্ট সার্কিট কারেন্ট গ্রাউন্ডিং হওয়ার মতো কোনো ব্যবস্থাও রাখা হয়নি। লাইনে কোনো নিউট্রাল তার বা স্কাই ওয়্যারও নেই। ফলে হাইভোল্টেজ শর্ট সার্কিটের আগুন বা ফ্ল্যাশিংয়ের কারণে মানুষ, পশুপাখি এবং বাড়িঘরের বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, এর আগেও তারা স্থানীয় প্রশাসনসহ কোম্পানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমস্যার কথা জানিয়েছেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় সেনাবাহিনীর সদস্যরা সরেজমিনে পরিদর্শন করে লাইনটির ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা দেখতে পান বলে দাবি করেন তারা। পরবর্তীতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে লাইনটি ঝুঁকিমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিলেও কোম্পানি তা বাস্তবায়ন করেনি। ফলে পরবর্তীতে একাধিক দুর্ঘটনা ঘটে।
এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ, বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিকার চাইলেও তারা কর্ণপাত করে না; বরং বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাব দেখিয়ে নিরীহ গ্রামবাসীকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে।
গত ২৭ মে বিদ্যুতের আগুনে দগ্ধ হওয়া স্থানীয় দোকানদার আরিফ বলেন, “এখানে প্রায়ই স্পার্কিং হয়, আগুন লাগে। টিভি, ফ্রিজ, মিটারসহ অনেক কিছু পুড়ে যায়। এ বিষয়ে বারবার অভিযোগ করা হলেও তারা কোনো সমাধান করেনি। ঈদের আগের দিন সকাল ৮টার দিকে বৈদ্যুতিক খুঁটির তার থেকে আগুন ছিটকে আমার শরীরের ওপর পড়ে। পাঞ্জাবি খুলে দৌড়ে গেলেও শরীরের অনেক অংশ পুড়ে যায়। কোম্পানির লোকজনকে জানালে তারা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছে।”
স্থানীয় বাসিন্দা নূর হোসেন সিদ্দিকী বলেন, “আমার বাড়ির আইপিএস, সাবমার্সিবল মোটর, ফ্রিজ, মিটার—চারটি ঘরের প্রায় সব বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি পুড়ে গেছে। নতুন করে টাকা খরচ করে ঠিক করলেও কিছুদিন পরপর আবার নষ্ট হয়ে যায়।”
কেশরাব এলাকার নুরে আলম সিদ্দিকী বলেন, “আমি কিস্তিতে এক লাখ ৩৮ হাজার টাকা দিয়ে একটি গরু কিনেছিলাম। বিদ্যুতের ফায়ারিংয়ের কারণে গরুটি মারা যায়। কোম্পানির মালিকপক্ষের প্রতিনিধি প্রিন্সকে জানালে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৫০ হাজার টাকা দেয়। বাকি টাকা পরে দেওয়ার কথা বললেও আর দেয়নি।”
কেশরাব ও দক্ষিণপাড়া জামে মসজিদের ইমাম বলেন, “একটু বাতাস হলেই তারে তারে ঘষা লেগে আগুন জ্বলে ওঠে। সকালে মক্তব ও স্কুলের শিক্ষার্থীরা আতঙ্কে থাকে। একবার দুজন শিক্ষার্থী ভয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। মসজিদের ডিজিটাল ঘড়ি, আইপিএস, ফ্যান ও মাইক নষ্ট হয়ে গেছে।”
রিকশাচালক ও মৎস্যচাষি আলামিন বলেন, “আমি রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করি। ভাড়ায় পুকুর নিয়ে মাছ চাষ করি। বিদ্যুতের ফায়ারিংয়ের কারণে বিক্রির উপযোগী মাছ মারা গেছে। একবার নয়, কয়েকবার এমন হয়েছে। এখন আমি ঋণের বোঝায় জর্জরিত।”
এলাকার ৭৫ বছর বয়সী এক নারী বলেন, “জিনিসপত্র ক্ষতি হলে দুই-চার হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে আসে। কিন্তু মানুষ মারা গেলে তার দায় কে নেবে? কয়জনকে সাহায্য করবে? মানুষ বাঁচাতে হলে এখান থেকে খুঁটি সরাতে হবে।”
গ্রামের মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস ও চলাচল থেকে মুক্তি পেতে প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়ে বিভিন্ন দপ্তরে স্মারকলিপি দিয়েছেন বলে জানান এলাকাবাসী।
এ বিষয়ে রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলামের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।








