গল্প
কফি কাপের ওপারে এক আকাশ প্রেম
-নাফিজ আশরাফ
সেদিন ছিল বৃষ্টির দিন। ক্যাম্পাসের সবুজে ভেজা ঘ্রাণ আর আর্দ্র বাতাসের ফিসফিসানি। অর্নব আর্টস ফ্যাকাল্টির করিডোরে দাঁড়িয়ে ছিল, হাত-ব্যাগে আঁকা স্কেচগুলো আগলে। সে ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র, স্বপ্ন দেখে আর্ট গ্যালারিতে নিজের ছবির প্রদর্শনী করার। তার বাবা-মা দুজনই সরকারি চাকুরে, মধ্যবিত্তের হিসেবি জীবনেও ছেলের শিল্পচর্চায় তাদের সম্পূর্ণ সমর্থন আছে।
হঠাৎ, বইয়ের স্তূপ হাতে নিয়ে প্রায় পড়েই যাচ্ছিল একটি মেয়ে। অর্নব হাত বাড়িয়ে কোনোমতে ধরে ফেলল তাকে, আর মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল গোটাকয়েক বই।
“সরি! একদম দেখিনি…” মেয়েটি প্রায় ফিসফিস করে বলল, গাল দুটো সামান্য লাল।
“ইটস ওকে,” অর্নব হেসে বলল, বইগুলো তুলে দিতে দিতে। “আপনি বোধহয় নতুন?”
“হ্যাঁ,” মেয়েটি হাসল। “আমি অনুষ্কা। ফার্স্ট ইয়ার, লিটারেচার।”
অনুষ্কার চোখে-মুখে এক ধরনের আভিজাত্য ছিল, যা মুহূর্তেই চোখে পড়ে। পোশাক-আশাকে ছিল রুচির ছাপ, কিন্তু আচরণে কোনো অহংকার নেই। বরং এক ধরনের সহজ সারল্য। অর্নব জানত, অনুষ্কার বাবা শহরের অন্যতম নামকরা শিল্পপতি, তবে সেসবে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। তার চোখে তখন শুধু সদ্য স্নান করা আর্দ্র চুল আর বৃষ্টিভেজা ঠোঁটের হাসি।
সেই প্রথম দিনের পরিচয়েই কফির গন্ধ আর ভেজা মাটির সুর মিশে গিয়েছিল তাদের জীবনে। এরপর ক্যাম্পাসের কফি শপ, লাইব্রেরির কোণ, বা ফ্যাকাল্টির বাগানে তাদের দেখা হওয়াটা যেন এক রুটিনে পরিণত হলো। অর্নব তার ক্যানভাসে প্রকৃতির রং ভরত, আর অনুষ্কা তার ডায়েরির পাতায় শব্দের আলপনা আঁকত।
তাদের সম্পর্কটা ঠিক কখন শুধুই বন্ধুত্ব থেকে ভালোবাসায় মোড় নিল, তা তারা কেউই নির্দিষ্ট করে বলতে পারবে না। হয়তো সেটা কোনো এক বসন্তের দুপুরে, যখন অর্নব একটা ছবি আঁকছিল– ছবির বিষয় ছিল অনুষ্কার হাসি। অনুষ্কা বলেছিল, “আমার হাসি কি এতই সুন্দর, যে তা ক্যানভাসে তুলতে হচ্ছে?” অর্নব সরাসরি তার চোখে তাকিয়ে বলেছিল, “আপনার হাসিটা আমার কাছে বিশ্বের সেরা শিল্পকর্ম, অনুষ্কা।”
সেদিনের পর তাদের কথায় ‘তুমি’ শব্দটা এল, হাতে হাত রাখায় এক নতুন উষ্ণতা এল। তাদের প্রেমের দিনগুলো ছিল যেন এক মুক্ত হাওয়ায় ওড়ার মতো। অর্নব কখনও কখনও টিফিন টাইমে নিজের হাতে বানানো চিলি-চিকেন নিয়ে আসত, আর অনুষ্কা হাসতে হাসতে বলত, “শিল্পীর হাতের রান্নাও এত সুস্বাদু হয়?”
তবে তাদের প্রেমের সবচেয়ে আনন্দের দিক ছিল তাদের একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ। অনুষ্কা কখনও অর্নবের আর্থিক অবস্থা নিয়ে একটি কথাও বলেনি, বরং তার শিল্পকে মনেপ্রাণে উৎসাহিত করেছে। আর অর্নব কখনও অনুষ্কার প্রাচুর্য নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগেনি। তাদের কাছে তাদের সম্পর্ক ছিল একান্তই তাদের, যেখানে বাইরের জগতের কোনো প্রবেশাধিকার ছিল না।
এই আনন্দ আর স্বপ্নের দিনগুলো বেশিদিন মেঘমুক্ত রইল না। অনুষ্কার বাবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি একদিন ঠিক তাদের আবিষ্কার করল।
একদিন সন্ধ্যায়, অর্নব আর অনুষ্কা শহরের এক পুরোনো পার্কে বসে ভবিষ্যৎ নিয়ে গল্প করছিল। অনুষ্কার ফোন এল। ওপাশে বাবার কঠিন কণ্ঠস্বর। পরদিন অনুষ্কা ক্যাম্পাসে এল, কিন্তু চোখে-মুখে আনন্দের কোনো চিহ্ন ছিল না।
“বাবা জেনে গেছেন, অর্নব,” অনুষ্কা মৃদুস্বরে বলল।
“তাতে কী হয়েছে? আমাদের তো লুকোনোর কিছু নেই,” অর্নব কিছুটা অবাক হয়েই বলল।
“আছে। বাবা মনে করেন, আমাদের দুজনের অবস্থান আলাদা। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, আমি যেন এসব সম্পর্ক থেকে দূরে থাকি,” অনুষ্কার চোখে জল চিকচিক করছিল।
অনুষ্কার বাবা, চৌধুরী সোবহান, একজন অত্যন্ত সফল এবং রক্ষণশীল মানুষ। তিনি মনে করেন, তার মেয়ে যার জীবনসঙ্গী হবে, তার শুধু অর্থ থাকলেই হবে না, পারিবারিক ঐতিহ্যও থাকতে হবে। তার চোখে, অর্নব কেবল একজন ‘উঠতি শিল্পী’ যার ভবিষ্যতের কোনো স্থিরতা নেই। তিনি অর্নবের বাবা-মাকে ফোন করে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, “আপনার ছেলে যেন আমার মেয়ের আশেপাশে আর না ঘেঁষে।”
অর্নবের বাবা-মা খুব শান্ত এবং যুক্তিবাদী মানুষ। তারা অর্নবকে ডেকে বসালেন। তার বাবা বললেন, “বাবা, অনুষ্কা খুব ভালো মেয়ে হতে পারে, কিন্তু একটা সম্পর্ক শুধু ভালোবাসায় টেকে না। অর্থনৈতিক সমতা, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি—এগুলোও খুব গুরুত্বপূর্ণ। মি. সেনের সঙ্গে আমাদের জীবনযাত্রার আকাশ-পাতাল তফাৎ। আমরা চাই না তুমি কোনও হতাশায় পড়ো।”
অর্নব নিজের হৃদয়ে ভালোবাসার তীব্র টান এবং পরিবারের উদ্বেগের চাপ অনুভব করল। অনুষ্কাও একইরকম যন্ত্রণায় ভুগছিল। তাদের দেখা হওয়া কমে গেল, ফোনে কথা বলার সময়ও বেড়ে গেল নীরবতা।
একদিন অনুষ্কা বলল, “অর্নব, মনে হচ্ছে আমাদের সম্পর্কটা একটা অসম্ভব স্বপ্নের মতো। তুমি হয়তো একদিন বিরাট শিল্পী হবে, কিন্তু এই মুহূর্তের বাস্তবটা বড় কঠিন।”
অর্নবের ভেতরে জেদ চেপে গেল। সে অনুষ্কার হাত ধরে বলল, “অনুষ্কা, ভালোবাসার কোনো স্ট্যাটাস হয় না। আমরা লড়াই করব। তুমি শুধু আমার হাতটা ছেড়ো না।”
অনুষ্কা আর অর্নবের প্রেম তখন এক অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। তারা ঠিক করল, আপাতত তারা নিজেদের ক্যারিয়ারের দিকে মনোযোগ দেবে। তাদের দেখা-সাক্ষাৎ হবে না, কিন্তু প্রতিদিন সন্ধ্যায় একটি নির্দিষ্ট সময়ে তারা একে অপরকে একটি মাত্র মেসেজ পাঠাবে– তাতে থাকবে শুধু একটি করে ভালোবাসার শব্দ।
অর্নব আরও বেশি করে ডুবে গেল তার শিল্পকর্মে। দিনের পর দিন পরিশ্রম করতে থাকল। সে প্রমাণ করতে চেয়েছিল, একজন শিল্পী শুধু স্বপ্নে বাঁচে না, সেও জীবন গড়তে পারে।
অন্যদিকে অনুষ্কাও মন দিল পড়াশোনায়। বাবার চোখে সফল হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা কাজ করছিল তার মধ্যে। প্রায় ৬ মাস পর, অর্নব একটি জাতীয় স্তরের আর্ট কম্পিটিশনে প্রথম স্থান অধিকার করল। তার আঁকা ছবিটি ছিল অনুষ্কার চোখ, যেখানে ভালোবাসা, যন্ত্রণা, আর এক গভীর প্রতীক্ষা ফুটে উঠেছিল। খবরের কাগজ, সোশ্যাল মিডিয়া—সবখানেই তার নাম ছড়িয়ে পড়ল।
এই সাফল্যের দিনেই অনুষ্কা সাহস করে তার বাবাকে অর্নবের সেই বিখ্যাত ছবির কথা বলল। মি. সেন, যিনি সবসময়ই শিল্পের সমঝদার ছিলেন, তিনি অর্নবের এই সাফল্যের খবর আগেই জানতেন। সেদিন রাতে তিনি মেয়ের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“তুমি কি সত্যিই ছেলেটিকে ভালোবাসো, অনু?”
“হ্যাঁ, বাবা। ওর স্বপ্নকে আমি ভালোবাসি, আর ওকে বিশ্বাস করি,” অনুষ্কা চোখে জল নিয়ে উত্তর দিল।
মাস দুয়েক পর। অর্নব তার প্রথম আর্ট গ্যালারির প্রদর্শনী শুরু করেছে। গেটের কাছে অনুষ্কা তার বাবার হাত ধরে দাঁড়িয়ে। মি. সেন অর্নবের কাছে এলেন, চোখে-মুখে এক অদ্ভুত অভিব্যক্তি।
“অর্নব, তুমি প্রমাণ করেছ, তোমার প্রতিভা শুধু স্বপ্ন নয়, বাস্তব। আমার ভুল হয়েছিল। আমি ভুলে গিয়েছিলাম, অর্থ নয়, মানুষের ভেতরের মূল্যটাই আসল।”
অর্নব শুধু হাসল। তার ভেতরের সমস্ত যন্ত্রণা আর অপেক্ষার অবসান হলো যেন। সে অনুষ্কার দিকে তাকাল। অনুষ্কার চোখে তখন আনন্দাশ্রু। তাদের এই ছয় মাসের দূরত্ব যেন তাদের বন্ধনকে আরও মজবুত করেছে।
অর্নবের বাবা-মাও তাদের পাশে এলেন, মি. সেনকে হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানালেন। সেই মুহূর্তে অর্নব বুঝল, ভালোবাসা শুধু দুটো মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটা দুটো পরিবার, দুটো ভিন্ন জগৎকেও এক করে দিতে পারে।
পরের দিন ক্যাম্পাসের সেই পুরোনো কফি শপে তারা আবার মুখোমুখি। অনুষ্কা কফির কাপটা অর্নবের দিকে এগিয়ে দিয়ে হাসল।
“আমাদের প্রেমটা একটা থ্রিলার গল্পের মতো ছিল, তাই না?”
অর্নব অনুষ্কার হাত ধরে বলল, “না, অনুষ্কা। এটা ছিল ধৈর্যের গল্প। অপেক্ষার গল্প। আর সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের ভালোবাসার গল্প, যার শেষটা কখনোই হতাশায় মোড়া নয়।”
তাদের সামনে তখন এক নতুন আকাশ, ভালোবাসার রঙে রাঙানো। কফির কাপের ওপারে বসে তারা দেখল, তাদের মতো আরও অনেক তরুণ-তরুণী হাতে হাত রেখে স্বপ্নের জাল বুনছে।
অক্টোবর ০৬-২০২৫








