নারায়ণগঞ্জ সদর ভূমি অফিসে ওমেদার সিন্ডিকেটের রাজত্ব !
রিয়াদ-মোজাম্মেল চক্রের বিরুদ্ধে কোটি টাকা লেনদেন, নদী ও
খাসজমির নামজারির অভিযোগ; নতুন এসিল্যান্ডকে ঘিরেও ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা
Tnntv24নিজস্ব প্রতিবেদক :
‘কোনো ভূমি অফিসে ওমেদার নামে দালাল থাকবে না’—নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবিরের এমন কঠোর ঘোষণার পরও নারায়ণগঞ্জ সদর ভূমি অফিসে উমেদারদের দৌরাত্ম্য নিয়ে উঠেছে গুরুতর অভিযোগ।
সরকারি দপ্তরের ভেতরে বসে বেসরকারি ব্যক্তিদের মাধ্যমে ভূমিসংক্রান্ত কাজে প্রভাব বিস্তার, কর্মকর্তাদের পরিচয় ব্যবহার, নামজারি ও খতিয়ান সংশোধনের নামে অর্থ আদায় এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এমন অপরাধের সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশের পরেও এখনো সেই ওমেদার চক্র রয়েছে বহাল তবিয়তে।
গত ১৫ অক্টোবর বৃহস্পতিবার দুপুরে রূপগঞ্জ উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির জানান, উপজেলার কোনো ভূমি অফিসে ওমেদার নামে দালাল থাকবে না।
সাধারণ মানুষ যাতে দালালের হয়রানি ছাড়াই ভূমিসেবা পান, সে জন্য জেলা প্রশাসন নিয়মিত নজরদারি করছে। তাঁর এই বক্তব্যের পর নারায়ণগঞ্জ সদর ভূমি অফিসের কথিত উমেদার সিন্ডিকেটের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, জেলা প্রশাসকের এমন ঘোষণার পরও সদর ভূমি অফিসে উমেদারদের কথিত প্রভাব কতটা কমেছে ? নাকি দালালমুক্ত ভূমি অফিস গড়ার ঘোষণার আড়ালেই পুরোনো সিন্ডিকেট নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে তৎপর?
দীর্ঘদিনের প্রভাব নিয়ে রিয়াদ-মোজাম্মেলকে ঘিরে অভিযোগ
নারায়ণগঞ্জ সদর ভূমি অফিসের কথিত ওমেদার রিয়াদ হোসেন ও পিয়ন মোজাম্মেলকে ঘিরে উঠেছে নানা অভিযোগ। অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ভূমি অফিসের বিভিন্ন কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নাম-পরিচয় ব্যবহার করে নিজেদেরকে ক্যাশিয়ার পরিচয় দিয়ে তাঁরা ভূমিসংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। এমনকি নিজেদের কর্মকর্তাদের ঘনিষ্ঠ ও ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দিয়ে সেবাপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
রিয়াদ হোসেনকে সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাদিয়া আক্তারের কথিত ক্যাশিয়ার হিসেবে অভিহিত করছেন অভিযোগকারীদের কেউ কেউ। সাদিয়া আক্তারের সরকারি ব্যক্তিগত আইডি ব্যবহার করে ভূমি সংক্রান্ত সকল অপকর্ম সম্পাদন করে যাচ্ছে এই ওমেদার হোসেন।
প্রশ্ন হচ্ছে, একজন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বাইরে থাকা কোনো ব্যক্তি কীভাবে সরকারি ভূমি অফিসের গুরুত্বপূর্ণ নথি, নামজারি কিংবা খতিয়ান সংশোধনের মতো স্পর্শকাতর কাজে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পান? এর পেছনে কারও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
নদী ও খাসজমির নামজারি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সিএস, এসএ ও আরএস রেকর্ডভুক্ত নদী, সরকারি খাসজমি এবং জলাশয়ের জমি নামজারি নিয়ে। ভূমি অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বরাত দিয়ে অভিযোগ করা হচ্ছে, এসব জমির শ্রেণি, মালিকানা ও সরকারি স্বার্থ যাচাই না করেই কিছু ক্ষেত্রে নামজারির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যা অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে তদন্ত করলে বেরিয়ে আসবে কতটা অপকর্মে লিখতে ছিল এই ওমেদার চক্র ও তার কর্মকর্তারা।
অভিযোগ অনুযায়ী, বদলির আদেশ কার্যকর হওয়ার আগে সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাদিয়া আক্তারের সময়ে এসব বিষয়ে তৎপরতা ছিল।
বিশেষ করে ২ অক্টোবর শুক্রবার ও ৩ অক্টোবর শনিবার সরকারি ছুটির দিনে সদর ভূমি কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের নথিপত্রসহ খানপুর এলাকার কার্যালয়ে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ওই সময়ের মধ্যে কয়েকটি বিতর্কিত জমির নামজারি ও রেকর্ড সংশোধনের কাজ সম্পন্ন করার চেষ্টা হয়। এ কাজে রিয়াদ হোসেন ও মোজাম্মেলের ভূমিকা ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে কোন মৌজার কত নম্বর খতিয়ান, কোন দাগের জমি, কার নামে এবং কোন আদেশে নামজারি হয়েছে—এসবের সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করে অভিযোগগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব। তাই সংশ্লিষ্ট নামজারি মামলার নথি, আদেশপত্র, ডিসিআর, ভূমি উন্নয়ন করের তথ্য এবং ই-নামজারি সার্ভারের কার্যক্রম পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
নদীকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণা: আইনের দোহাই, নাকি আইনের বাস্তব প্রয়োগ ?
২০১৯ সালের জানুয়ারিতে রিট পিটিশন নং ১৩৯৮৯/২০১৬-এর পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বাংলাদেশের সব নদ-নদীকে জীবন্ত সত্তা বা আইনি সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেন। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে নদীগুলোর অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টিও ওই ঐতিহাসিক রায়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
নদী, জলাশয় ও সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় আদালতের নির্দেশনা এবং প্রচলিত ভূমি আইনের আলোকে কোনো জমির প্রকৃত শ্রেণি ও মালিকানা যাচাই ছাড়া নামজারি করা যায় না। বিশেষত নদী বা সরকারি খাসজমি ব্যক্তির নামে রেকর্ডভুক্ত করার ক্ষেত্রে আইনগত ভিত্তি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত এবং আদালতের নির্দেশনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সুতরাং সদর ভূমি অফিসে নদী ও খাসজমির নামজারি নিয়ে ওঠা অভিযোগ সত্য হলে তা কেবল প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, সরকারি সম্পত্তি ও জনস্বার্থের জন্যও গুরুতর হুমকি। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি বিতর্কিত নামজারির বৈধতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
ইউএনডিপি খতিয়ান সংশোধনেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ
অভিযোগের এখানেই শেষ নয়। ইউএনডিপি খতিয়ান এন্ট্রি ও সংশোধনের কাজেও রিয়াদ হোসেন ও মোজাম্মেলের বিরুদ্ধে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁরা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সরকারি পরিচয় ও আইডি ব্যবহারের মাধ্যমে বিভিন্ন কাজ করিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিতেন।
এমনকি এসব কাজের জন্য লাখ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। প্রশ্ন হলো, সরকারি কর্মকর্তার পরিচয় বা আইডি যদি কোনো বেসরকারি ব্যক্তি ব্যবহার করে থাকেন, তাহলে সেটি কীভাবে সম্ভব হলো ?
সংশ্লিষ্ট সরকারি আইডির লগইন হিস্ট্রি, ব্যবহারকারীর পরিচয়, ওটিপি ও অনুমোদনের ডিজিটাল রেকর্ড পরীক্ষা করলেই বিষয়টির প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জীবনযাপন ও সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখা হলে তাঁদের আয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তবে এ বিষয়ে কোনো সম্পদ বিবরণী বা যাচাইকৃত আর্থিক তথ্য প্রকাশ্যে না থাকায় কাউকে অবৈধ সম্পদের মালিক হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই।
নতুন এসিল্যান্ড, পুরোনো চক্রের প্রভাবের আশঙ্কা
সাদিয়া আক্তারের বদলির পর নারায়ণগঞ্জ সদর ভূমি অফিসে নতুন সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে আসমাউল হুসনা পিংকির যোগদানকে ঘিরেও নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। গত অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে তিনি দায়িত্ব গ্রহণের জন্য কার্যালয়ে যোগদানপত্র জমা দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
কিন্তু নতুন কর্মকর্তার দায়িত্ব গ্রহণের পরও পুরোনো কথিত ওমেদার চক্রের তৎপরতা থেমেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, রিয়াদ হোসেন ও মোজাম্মেল নতুন এসিল্যান্ডের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। তাঁকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে না দেওয়ার অপচেষ্টার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন অভিযোগকারীরা।
অন্যদিকে, বিদায়ী কর্মকর্তা সাদিয়া আক্তার পুনরায় নারায়ণগঞ্জে বদলি হয়ে আসার চেষ্টা করছেন—এমন গুঞ্জনও ছড়িয়েছে। তবে এ বিষয়ে কোনো সরকারি নথি বা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
জেলা প্রশাসনের কঠোর নজরদারি এখন সময়ের দাবি
নারায়ণগঞ্জ সদর ভূমি অফিসের এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে জেলা প্রশাসকের সরাসরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। শুধু দালালমুক্ত ভূমি অফিসের ঘোষণা নয়, বাস্তবে সরকারি দপ্তরকে উমেদারমুক্ত করা, প্রতিটি নামজারি ও খতিয়ান সংশোধনের নথি নিরীক্ষা, সরকারি ডিজিটাল আইডির ব্যবহার পরীক্ষা এবং অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি।
বিশেষ করে গত কয়েক বছরে নদী, সরকারি খাসজমি ও জলাশয়ের যেসব নামজারি সম্পন্ন হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে সন্দেহজনক আবেদনগুলো চিহ্নিত করে পুনরায় যাচাই করা দরকার। একই সঙ্গে সরকারি কর্মচারীদের পাশাপাশি বেসরকারি ব্যক্তিরা কীভাবে দাপ্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করছেন, সেটিও তদন্তের আওতায় আনতে হবে।
জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবিরের ঘোষণার বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চান সদর উপজেলার সাধারণ মানুষ। তাঁদের প্রত্যাশা, ভূমি অফিস কোনো ব্যক্তি বা কথিত সিন্ডিকেটের ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণে নয়, বরং সরকারি আইন ও বিধি অনুযায়ী পরিচালিত হবে।
এখন দেখার বিষয়, নারায়ণগঞ্জ সদর ভূমি অফিসের কথিত রিয়াদ-মোজাম্মেল
চক্রের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত হয় কি না, নাকি দালালমুক্ত ভূমি অফিসের ঘোষণা কেবল বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।








