শ্রমিক বিক্ষোভ: ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ইটপাটকেল ,
টিয়ারশেল,সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ -কয়েকজন আহত
Tnntv24.নিজস্ব প্রতিবেদক:
মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে টানা তৃতীয় দিনের মতো উত্তপ্ত ছিল নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চল। বুধবার (৪ নভেম্বর) সকালে ফতুল্লায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের প্রায় এক ঘণ্টা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। এ সময় কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে পুলিশ। তবে জেলার অন্য কোথাও বিক্ষোভ বা সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেনি; স্বাভাবিক ছিল জনজীবন ও যান চলাচল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জেলার বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থান দেখা যায়।
এদিকে শ্রমিকদের দাবির মুখে গঠিত মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে নতুন মজুরিকাঠামো ঘোষণার প্রক্রিয়া চলছে উল্লেখ করে শ্রমিকদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি ও গার্মেন্টস শ্রমিক নেতারা।
একই সঙ্গে আন্দোলনকে ঘিরে অস্থিতিশীলতা তৈরির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে সতর্ক থাকার কথা জানিয়েছেন বিএনপি নেতারা। অন্যদিকে শ্রমিক নেতারা দ্রুত নতুন মজুরি-কাঠামো ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন।
আগেরদিনের ধারাবাহিকতায় বুধবার ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে সকাল ১০টার দিকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়কের পাশে কুতুবআইল কাঠেরপুল এলাকায় জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন ফতুল্লার কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা। এ সময় শুরুতে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা এবং পরে পুলিশ সদস্যরা শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান। শ্রমিকরা তাতে সাড়া না দিয়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশ তাতে বাধা দেয়।
এক পর্যায়ে শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। এ সময় আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে পুলিশ।
প্রায় এক ঘণ্টা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার পর পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এদিকে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পিঠালিপুল এলাকায় শ্রমিকরা জড়ো হওয়ার চেষ্টা করলে সেখানেও কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে আন্দোলনকারী শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ।
এদিন পরিস্থিতি মোকাবিলায় নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া, শিবু মার্কেট, ফতুল্লা স্টেডিয়াম, জালকুড়ি, সাইনবোর্ড, ফতুল্লার বিসিক শিল্পাঞ্চল, সিদ্ধিরগঞ্জ ইপিজেড, সোনারগাঁয়ের কাঁচপুর শিল্পাঞ্চল, টিপরদী, বন্দরের মদনপুর, রূপগঞ্জের তারাব, বরপা ও ভুলতা এলাকাসহ জেলাজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থান দেখা গেছে।
জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তারেক আল মেহেদী প্রেস নারায়ণগঞ্জকে বলেন, “সকালে ফতুল্লা এলাকায় শ্রমিকরা মূল সড়কে ওঠার চেষ্টা করলে তাদের আমরা মজুরি বোর্ড গঠন হয়েছে এবং সিদ্ধান্ত একটা আসবে জানিয়ে নিবৃত করার চেষ্টা করি। কিন্তু তারা না শোনায় পরে তাদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়া হয়। আমরা কোনোভাবেই রাস্তা দখল করে জনভোগান্তি তৈরি করতে দেবো না।”
এ ঘটনায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টার অভিযোগে কয়েকজনকে আটক করার কথাও জানান তিনি।
কাঠেরপুল এলাকার মেট্রো নিটিং অ্যান্ড ডাইং কারখানার এক শ্রমিক অভিযোগ করে বলেন, “আমরা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছিলাম। বিএনপির নেতারা এসে আমাদের শ্রমিকদের মারধর করেন।”
এদিকে পুলিশের ছোড়া টিয়ার গ্যাসে স্থানীয় একটি হোসিয়ারি কারখানার শ্রমিক জান্নাত (১৮) অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁকে পাঁজাকোলা করে হাসপাতালে নিয়ে যেতে দেখা যায়।
তাঁর আরেক সহকর্মী নার্গিস বলেন, “পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের ঝামেলা হবার পরই আমাদের হোসিয়ারি ছুটি দিয়ে দেয়। আমরা বেরিয়ে আসার পর রাস্তায় টিয়ার শেলের মধ্যে পড়ে যাই।”
সতর্ক নজর বিএনপির
এদিকে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির এই আন্দোলনকে ঘিরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ বিএনপি নেতাকর্মীদের। এমন পরিস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জে দলটির নেতাকর্মীদের সতর্ক অবস্থান দেখা গেছে।
ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়কে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার পর মহানগর বিএনপির সভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন। আন্দোলনে শ্রমিক পরিচয় দেওয়া অনেকের ‘পরিচয়পত্রের সঙ্গে চেহারার মিল নেই’ অভিযোগ করে তিনি বলেন, “গুপ্ত সংগঠনের কিছু লোক দেশকে অস্থিতিশীল করতে তাদের লোকজনকে শ্রমিকদের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে। এই ষড়যন্ত্র সফল হবে না। উস্কানিদাতাদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।”
তার আগে ফতুল্লা এলাকায় দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে অবস্থান নেওয়ার সময় থানা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াদ চৌধুরী প্রেস নারায়ণগঞ্জকে একই অভিযোগ করেন।
এ সময় বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি। বলেন, “শ্রমিকরা আমাদের রাজনৈতিক বা সামাজিক শত্রু নয়। আমরা নিজেরাও শ্রমিকদের দাবির সঙ্গে একমত। তাদের এই যৌক্তিক দাবিকে কেন্দ্র করে মিথ্যা অপপ্রচারের মাধ্যমে এই শিল্পের যেন কেউ ক্ষতি করতে না পারে আমরা সে বিষয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলেছি।”
সকালে সিদ্ধিরগঞ্জ, কাঁচপুর ও টিপরদী এলাকার তৈরি পোশাক শ্রমিক ও মালিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন জেলা যুবদলের সদস্য সচিব খাইরুল ইসলাম সজিব। সজিব একই সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের রাজনৈতিক সচিবের দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি বলেন “এই শ্রমিকদের শ্রমে-ঘামে আমাদের অর্থনীতি টিকে আছে। বিগত জুলাই আন্দোলন থেকে শুরু করে এদেশের মুক্তিকামী মানুষের সকল লড়াই-সংগ্রামে এই শ্রমিকরা জীবন দিয়েছে। বিএনপি বাংলাদেশকে একটি শ্রমিকবান্ধব দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। ফলে বেতন বৃদ্ধির দাবি ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। সবগুলো পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে নতুন মজুরিকাঠামো ঘোষণার প্রক্রিয়া চলছে।”
“ফলে আমরা শ্রমিকদের কাছে সময় চেয়েছি, সহযোগিতা চেয়েছি। সিদ্ধিরগঞ্জ-সোনারগাঁয়ের শ্রমিকরা আমাদের বলেছেন যে, তারা সরকারের ওপর আস্থা রাখেন। শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির যৌক্তিক দাবিকে কেন্দ্র করে পতিত ফ্যাসিস্ট শক্তি যেন দেশে অরাজকতা তৈরি করতে না পারে সে বিষয়ে শ্রমিকরা সচেতন আছেন। আমরা তাঁদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছি,” যোগ করেন সজিব।
এদিকে টানা চতুর্থ দিনের মতো রূপগঞ্জের তারাব পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় নেতাকর্মীদের নিয়ে অবস্থান নেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। পরে দুপুরে তারা বরপা দলীয় কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
তারাব পৌর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আরিফ হাসান আরব প্রেস নারায়ণগঞ্জকে বলেন, “বুধবার বিকেল পর্যন্ত রূপগঞ্জ এলাকার পোশাক কারখানার শ্রমিকরা শান্তিপূর্ণভাবে কাজ চালিয়ে গেছেন।
তাদের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। শ্রমিকরা মজুরি বোর্ডের ওপর আস্থার কথা জানিয়েছেন। আমরা বিএনপি নেতাকর্মীরা শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তায় সতর্ক আছি।”
আন্দোলন বিষয়ে বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি এমএ শাহীন বলেন, “সরকার ঠিক সময়ে মজুরি বোর্ড গঠন করলে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতো না। বেতন বৃদ্ধির দাবিতে উত্তরা, গাজীপুর, আশুলিয়ার শ্রমিকরা আন্দোলনে নামলেও নারায়ণগঞ্জের শ্রমিকরা শান্ত ছিল। তবে গাজীপুরে শ্রমিকদের সঙ্গে প্রশাসন ও সরকার দলীয় লোকজনের বাড়াবাড়ি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ফতুল্লার কিছু কারখানার শ্রমিক ক্ষুব্ধ হয়ে সড়কে নেমে আসে।”
তিনি আরও বলেন, “এটা সত্য যে, আন্দোলনে আমরা সন্দেহজনক কিছু গতিবিধি খেয়াল করেছি। কিছু উস্কানিমূলক আচরণ, সিদ্ধান্ত, কিছু স্লোগান সন্দেহজনক। শিবু মার্কেটের শ্রমিকরা সাইনবোর্ড গিয়ে মহাসড়ক দখল করবে, ভুয়া ভুয়া কিংবা বিকেএমইএ সভাপতির বিরুদ্ধে স্লোগানের মতো কিছু বিষয় দেখে মনে হয়েছে এর পেছনে কেউ আছে।”
এ সময় তিনি শ্রমিকদের ধৈর্য ধরার পাশাপাশি দ্রুত নতুন মজুরিকাঠামো ঘোষণার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
কারখানার মালিকদের পক্ষ থেকেও অভিযোগ উঠেছে, সরকার শ্রমিকদের বেতন কাঠামো যৌক্তিকভাবে নির্ধারণে কাজ করছে। কিন্তু মজুরি বোর্ড গঠনের পরও শ্রমিক আন্দোলনকে ঘিরে কেউ কেউ অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে চাচ্ছে। এমনকি, স্থানীয় রাজনীতিকদের কেউ কেউ ব্যক্তিস্বার্থে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষ হয়ে অপর প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের উস্কে দিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন এক পোশাক কারখানার মালিক।
উদাহরণ হিসেবে তিনি ফতুল্লার মেট্রো গার্মেন্টসে বুধবার উদ্ভূত পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন।
স্থানীয় একটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, মেট্রো নিটিং অ্যান্ড ডাইং কারখানার শ্রমিকরা আন্দোলনে অংশ নিতে না চাইলেও বাইরে থেকে বহিরাগত লোকজন কারখানাটির মূল গেইটে ধাক্কাধাক্কি ও ভাঙচুরের চেষ্টা চালান।
এর আগে গত সোমবার ও মঙ্গলবার একই দাবিতে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করেন নারায়ণগঞ্জের শ্রমিকেরা। তাদের আন্দোলনের কারণে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে।
মঙ্গলবার বিকেলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষেও জড়ান শ্রমিকরা। এতে উভয় পক্ষের কয়েকজন আহত হন।
এ ঘটনায় বুধবার ভোররাতে ফতুল্লা মডেল থানায় একটি মামলা হয়।
মামলায় নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ২১ নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলায় অভিযোগ করা হয়, মঙ্গলবার ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়কে শ্রমিকদের আন্দোলনে উসকানি দিয়ে সড়ক অবরোধ, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের ওপর ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। এতে দুই পুলিশ সদস্য আহত হন।
ফতুল্লা মডেল থানার উপপরিদর্শক মিলন ফকির বাদী হয়ে মামলাটি করেন। গ্রেপ্তার ছয় আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হলেও আদালত আগামী ৯ নভেম্বর শুনানির দিন ধার্য করে তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।








